nagorikkantha

সাগর-রুণী হত্যাকান্ডের বিচার ঝুলে আছে, ঝুলে আছে শতাধিক সাংবাদিক খুন-গুমের মামলাও। আর তারই ধারাবাহিকতায় আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে সাংবাদিকদের জীবন-যাপন ক্রমশ অন্ধকারাচ্ছান্ন হয়ে উঠছে; খুন-গুমমুক্ত দেশ গড়ার জন্য নিবেদিত থাকেন নিরন্তর যারা; তারাই আজ যখন তখন নির্মম মৃত্যুর মুখোমুখি হচ্ছেন। ১৬-১৭ দিন ধরে নিখোঁজ সাংবাদিক উৎপল দাস। সাংবাদিক হিসেবে বরাবরই নিবেদিত থাকা কালোহীন আলোকিত সমাজ গড়ার কারিগর উৎপল দাস ছিলেন মায়ের জন্য নিরন্তর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিয়ে এগিয়ে চলা লোভ-মোহহীন নিরন্তর সংগ্রামী। আর তাই তিনি নিজের কণ্ঠে গাওয়া মাকে নিয়ে অসাধারণ একটি গান নিবেদন করেছেন। যা রেকডিং করা হয় বছর দুয়েক আগে মা দিবসে। গানটির লিঙ্ক আমাকে ইনবক্স করেছেন নতুন প্রজন্মের প্রিয় সাংবাদিক মশিউর রহমান রুবেল। তাঁর লিঙ্ক পাওয়ার পর মন দিয়ে গানটি শুনেছি আর ভেবেছি চঞ্চল-উচ্ছল এই সংবাদকর্মীর নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব যেখানে তথ্যমন্ত্রীর; সেখানে তথ্যমন্ত্রী-প্রশাসন সেই দায়িত্ব পালন না করে বরং বিষয়টি নিয়ে প্রহসনের দোকান খুলে বসেছে। এই বর্তমানের বাইরে বেরিয়ে আসতে তৈরি হতে হবে বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের সকল এমপি-মন্ত্রী-আমলাসহ সকল স্তরের জনগনকে। তা না হলে ক্রমশ সাংবাদিক মহল ক্ষতিগ্রস্থ হতেই থাকবে।

অনলাইন নিউজপোর্টাল পূর্বপশ্চিম বিডি ডটকমের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক উৎপল দাস নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে উৎকন্ঠায় আমাদের সাংবাদিক মহল। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বলছে যে- ১০ অক্টোবর রাজধানীর মতিঝিলে অবস্থিত পূর্বপশ্চিমের অফিস থেকে বের হওয়ার পর তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। ওইদিন থেকে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এ বিষয়ে তার পরিবারের সদস্যরা ও ভাড়া বাসার কেউ কিছু বলতে পারছেন না। এ ঘটনায় ২২ অক্টোবর রোববার রাজধানীর মতিঝিল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন পূর্বপশ্চিম কর্তৃপক্ষ। উৎপল দাস নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার থানাহাটি এলাকার চিত্ত দাসের পুত্র। তিনি রাজধানীর ফকিরাপুল এক নম্বর গলিতে ভাড়া বাসায় থাকতেন।

পূর্বপশ্চিমের সম্পাদক খুজিস্তা নূর-ই-নাহারিন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ১০ অক্টোবর দুপুর ১টার দিকে কাজ শেষে অফিস থেকে বের হন উৎপল দাস। এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ। তার ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন নম্বরই বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। পরিবার, সহকর্মী ও বন্ধুবান্ধবের কাছে অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। এ ঘটনায় উদ্বিগ্ন তার স্বজন ও সহকর্মীরা। উৎপল দাসের সন্ধান চেয়ে মতিঝিল থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। এরপর অবশ্য সাংবাদিক উৎপল দাসকে খোঁজা তো দূরের কথা তারা রাস্তা তৈরি করছে ছলা-কলার। যে রাস্তায় অগ্রসর হওয়ার কারনে নির্মমতা এগিয়ে আসছে ক্রমশ। আমরা এমন নির্মম বাংলাদেশ চাই না। আমরা চাই না নতুন করে উচ্চারিত হোক ‘বাতাসে লাশের গন্ধ।’ এখন কেবল উচ্চারণ করতে চাই- ‘স্বদেশজুড়ে আগুন/ দেশবাসী আজ জাগুন।’

উৎপল দাসের নিখোঁজ হওয়ার সাথে কেন যেন মনে হচ্ছে পুলিশের হাত আছে। যেভাবে অবজারভার-এর ফটো সাংবাদিক আসিফকে হয়রানি করে করে রাতভর মানষিক-শারিরীক নির্যাতনের পর ইয়াবা ব্যবসায়ী বলে চালান দিয়েছিলো; একইভাবে বুঝি উৎপলকেও একইভাবে কষ্টের যাতাকলে পিষ্ট করা হচ্ছে কি না জানা প্রয়োজন সবার আগে। এই বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মকে।

সম্প্রতি অনুজ সাংবাদিক সালমান তারেক শাকিল লিখেছে- আমি কোনও উৎপল দাসের সন্ধান দাবি করছি না। আমিও সন্ধান করছি না। তবে বিনয়ের সাথে তৈরি হওয়ার দাবী নিয়ে এসেছি দেশ ও মানুষকে ভালোবেসে। আমি শাকিলের সাথে একাত্মতা পোষণ করে বলতে চাই- জন্মের পর থেকে কোনও কালেই নিজের জন্মভূমি নিয়ে শতভাগ সন্তুষ্ট হতে পারিনি। এই না পারার ব্যর্থতা কার—সেদিকেও যাচ্ছি না। বহু বছর আগে, মানে স্বাধীনতার আগে ও পর থেকে গুম-খুন-নিখোঁজ এসব তো নিত্যই আমাদের সঙ্গী। ফলে ব্যক্তির নিরাপত্তার প্রশ্নটি সামনে রেখে বহুবছর আগে প্রয়াত সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী-রাজনীতিক নির্মল সেন বলেছিলেন, ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই।’ নির্মল সেন বুদ্ধিজীবী বলে এই স্বাভাবিকতার মরণ দেখেছিলেন, যা আমরা দেখেছি আমাদের বয়স বাড়ার পর। জীবনের হিসেবে ত্রিশ বছর খুব বেশি না। তারুণ্য, কৈশোর আর যৌবনের আসল খেলাটা এই বয়সেই হওয়ার কথা। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা আমাদের সামনে এনে দিয়েছে, ভেজাল জীবনের চেয়ে একা জীবন ভালো। এই রাষ্ট্র ক্রমাগত তার নাগরিকদের এই সত্যের মুখোমুখি করেছে। আর একইসঙ্গে তৈরি করেছে এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে গলাধকরণ করার কিছু লোক। ফলে, আমাদের সময়ে ত্রিশের কোনও ম্যাজিক নেই, আছে অবলুপ্তমনে সবকিছু দেখে-দেখে ইতরের মতো বেঁচে থাকা। আর একেই সামাজিক দায়বদ্ধতায় নাম দেওয়া হয়েছে ম্যাচিউরিটি। সাংবাদিক উৎপল দাস; আমার সহযোদ্ধা এবং বন্ধুর মতো হলেও তার সন্ধান দাবি করছি না। কারণ, একজন উৎপল দাস ঠিক আমার অভিব্যক্তি। আমি লিখি, উনিও লিখেন। আমি চাকরী করি, উনিও করতেন। ব্যবহার বা আদর্শ কিংবা চিন্তায় নানান ফাঁরাক থাকলেও মুক্তমনের যে বাতায়ন উৎপল দাসের বুকের ভেতরে ছিলো, সেটিই আমার সবচেয়ে বেশি ভালোলাগার এবং ক্ষেত্র বিশেষে প্রেমেরও। আমি ঠিক জানি না, উৎপল দাসের সমস্যা কোথায় ছিলো? খুব গোপনে রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান বা কোনও ব্যক্তি-উপদল বা কেউ-ই তার শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। কিন্তু এই শত্রুতার লক্ষ্মণ বড় খারাপ। অবাক হই না, এ কারণে আমাদের দেশে এই শত্রুতার ইতিহাস বড় দীর্ঘ। ফলে, আমি এই রাষ্ট্রের কাছে উৎপল দাসের সন্ধান দাবি করতে চাই না। এমনকী কোনও প্রতিবাদও। শুধুমাত্র একটা স্বপ্ন ও আর একটা ক্ষুদ্র আশা কেবল মনের মধ্যে কয়েকদিন ধরে পুষে রেখেছি। উৎপল দাস কোথাও থেকে লাইভে এসে বলবেন, ‘বন্ধুরা অনেকদিন গোপনে ছিলাম, চারটি গান আর দুটি কবিতা লিখেছি। আপনাদের শোনাব।’ কেন জানি, গত কয়েকদিন ধরে টানা দুঃস্বপ্ন দেখছি। কোনও দিন কেউ মারছে, কোনও দিন রাতে আবার কোনও প্রাণী খুবলে খাচ্ছে বাম হাত।আবার কোনও দিন দেখেছি পরিচিত চেহারার লোকেরাই কুপিয়েছে শরীরে। এসব দুঃস্বপ্নের মাঝে হঠাৎ আজ সোমবার খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যায়। রোদবারান্দায় দাঁড়িয়ে ভাবি, সকাল খুব সুন্দর ও পবিত্র।’

দেশের জন্য নিবেদিত থাকতে থাকতে তৈরি হয়েছি ছন্দিত-নন্দিত উচ্চারণে। রাজপথে কথা বলতে পিছপা হইনি কখনো; পিছপা হইনি নিবেদিত থেকে এগিয়ে যেতে। যখন গ্যাসের দাম বাড়ে, বিদ্যুতের দাম বাড়ে, বাড়ি ভাড়া বাড়ে, তেলের দাম বাড়ে, প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ে তখনই রাজপথে নেমে আন্দোলন করেছি। খুন-গুমের রাজনীতি, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজীর রাজনীতিতে আক্রান্ত সারাদেশ; তখন নতুন প্রজন্মের পক্ষ থেকে ক্রমশ সাহসের সাথে উচ্চারণ করেছি- দেশ বাঁচাতে তৈরি আমি, তৈরি আমার দেশটা/ চলুন সবাই এগিয়ে যাই সবাই করি চেষ্টা/ সাংবাদিক আর সংবাদপত্র বাঁচাতে চাই হাসি/ চলুন সবাই স্বপ্ন নিয়ে দেশকে ভালোবাসি...

মোমিন মেহেদী : চেয়ারম্যান, নতুনধারা বাংলাদেশ-এনডিবি