nagorikkantha

সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে অনেক উন্নত দেশ বিশেষ করে পশ্চিমা দেশসমূহে বেকার সংখ্যা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। এশিয়া ও আফ্রিকার দেশ গুলোর অবস্থাতো আরো খারাপ। মধ্য প্রাচ্য’সহ বেশ কিছু দেশে যুদ্ধ ও জাতিগত সমস্যাকে দায়ী করেন অনেকে। সারা বিশ্বে ২০ কোটি লোক বেকার এবং বেকারত্বের হার এখন ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। শিগগির এর হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনাও কম। তার প্রভাব থেকে আমাদের দেশও বাদ পড়ছেনা। বেকার সংখ্যা যেকোন উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা। দেশে বেকারের প্রকৃত সংখ্যা কত? তা নিয়ে বির্তক আছে বিস্তর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র (BBS) তথ্যানুযায়ী দেশে এখন বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ। প্রতিবছর পড়া লেখা শেষ করে ২৪-২৫ লাখ লোক শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। যারা কোন চাকুরী পায়না। বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৭ কোটির বেশী। তম্মধ্যে ১০ কোটি আছে কর্মক্ষম মানুষ। ০৫ কোটি মানুষ কাজ করছে। ০৫ কোটি মানুষ কাজ পায়না কোনভাবেই। বিভিন্ন ধরনের তথ্যানুযায়ী দেখা যায় যে, কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে শিক্ষিত ও অশিক্ষিত একদম বেকার কমপক্ষে ০৪ কোটির বেশী মানুষ।

বিবিএস-এর মতে ১৫ বছরের উর্ধ্বে অর্থনৈতিক কর্মক্ষম শ্রমশক্তি ৬ কোটি ৭ লক্ষ। এর মধ্যে ৫ কোটি ৮০ লক্ষ বিভিন্ন পেশায় ও উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত। অবশিষ্ট ২৭ লক্ষ পুরাপুরি বেকার। একই প্রতিবেদনে অবশ্য বলা হয়েছে-পরিবারের মধ্যে কাজ করেন কিন্তু কোন প্রকার মজুরি দেয়া হয়না অথবা পান না। এই ধরনের বেকারের সংখ্যা ১ কোটি ১১ লক্ষ। ১ কোটি ৬ লক্ষ লোক আছেন যাদের কোন কাজের ঠিক ঠিকানা অথবা নিশ্চয়তা নেই। এরা দিনমজুর। আর্ন্তজাতিক শ্রম সংস্থার (ওখঙ)-এর মতামত অনুযায়ী প্রকৃত অর্থে এরাও বেকার। তাহলে দেখা যায় যে, বিবিএস-এর প্রতিবেদন মতে বেকারের প্রকৃত সংখ্যা হবে ২ কোটি ৪৪ লক্ষ। উল্লেখ করার বিষয় হলো-মোট শ্রমশক্তিতে কৃষিজীবীর অংশ আগের চেয়ে অনেক কমেছে। তথাপি কৃষি কাজেই সবচেয়ে বেশি শ্রমশক্তি নিয়োজিত আছে।

বর্তমানে মোট শ্রমশক্তির মধ্যে কৃষিকাজে নিয়োজিত ৪৫.১০ শতাংশ বা ২ কোটি ৭৪ লক্ষ লোক কৃষি কাজে নিয়োজিত বা কৃষি শ্রমিক। তার মধ্যে ৫০% বা তারও বেশী লোকের সারা বছর কাজের কোন নিশ্চয়তা থাকে না। আর তাই যদি হয় তাহলে উক্ত অর্ধেক মানুষকেও বেকার বলা যায়। আর এই বেকার সংখ্যা হবে ৩ কোটি ৮১ লক্ষ।

বিবিএস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী কাজ করার মতো কর্মক্ষম জনসংখ্যার মধ্যে মহিলাদের সংখ্যাও কম নয়। ১ কোটি ৬২ লক্ষ মহিলা কর্মক্ষম। আর্ন্তজাতিক সংস্থা ইকোনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ঊওট)-ইকোনোমিস্টের (যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক) সাময়িকীর প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের ৪৭ ভাগ ¯œাতক পাশ লোক বেকার। ৫% লোক মারাত্মক (ঊীঃৎবসবষু)-ভাবে বেকার। বেকারত্বের হার ৪.১০%। একই আছে ২০১৫-২০১৬ সালে। বেকারের গড় হার ৩.৮৩। সর্ব্বোচ্চ ৫.১০% ছিল ১৯৯৭ সালে আবার সর্বনি¤œ ২.২০% ছিল ১৯৯১ সালে।

আইএলওর সংজ্ঞা অনুযায়ী, চার সপ্তাহ কাজ খুঁজছে অথচ পায়নি; কিন্তু আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যেই বিদ্যমান মজুরিতে কাজ শুরু করবে-এমন কর্মক্ষম মানুষকে বেকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বিবিএস বাংলাদেশ-এর শ্রমশক্তির ওপর যে জরিপ কাজ করেছে, তা এই সংজ্ঞার ওপর ভিত্তি করেই।

প্রতি বছর ২২ লক্ষ লোক কর্মক্ষম শিক্ষিত মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। কাজ পায় মাত্র ০৭ লক্ষ আর অবশিষ্ট ১৫ লক্ষই বেকার। এই তথ্য বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির ২০১২ সালের গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী।

বিশ্বব্যাংক মনে করে সরকার প্রতিবছর বেকারের সংখ্যা কম দেখায়। প্রকৃত পক্ষে বাংলাদেশে বেকারত্বের হার হবে ১৪.২ শতাংশ। তার মানে ২ কোটি ২ লক্ষ লোক বেকার। আইএলও-এর হিসেবে ২০১৫ সালে বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ কোটি। বেকারত্বের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের ১২তম স্থানে আছে এখনও। বিগত ১ দশকে বাংলাদেশে বেকারত্ব বেড়েছে ১.৬ শতাংশ এবং কর্মসংস্থান কমেছে ২ শতাংশ হারে। তার মানে দাঁড়ায় কর্মক্ষম মানুষ যে হারে বাড়ছে সে হারে কর্মসংস্থান হচ্ছে না। বাংলাদেশ এমপ্লয়াস ফেডারেশনের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে বিভিন্ন শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে ১০ লাখেরও বেশী লোক কাজ হারিয়েছে। বেকারত্বের অভিশাপ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে অনেকে বিপদগামী হয়ে জীবনের গতিপথ পরিবর্তন করতেও দেখা গেছে।

কোন কারণ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য’সহ অনেক দেশে ভিসা বন্ধ বহুদিন যাবৎ। যা জনশক্তি রফ্তানিকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। বেকার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পথে সাগর পাড়ি দিয়ে বিদেশ যেতে চেষ্টা করছে। অবৈধভাবে প্রবেশ-এর অপরাধে বিভিন্ন দেশের জেলখানায় আটক অথবা শাস্তিভোগকৃত অভিবাসি আছে অগণিত। অনেকে প্রতারিত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। অনেকের জীবন ঝুঁকির মুখে। আবার থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া’সহ বিভিন্ন দেশে গণকবরের নজিরও আছে। যা বেকারত্বের এক ভয়াবহ চিত্রই কেবল তুলে ধরে না, বিশ্ব বিবেক-কে চিন্তিতও করে।

বিদেশে জনশক্তি রফতানি কমে যাওয়াতে বেকারত্ব বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিদেশী অনুদান কমে যাওয়া, রেমিট্যান্স পর্যাপ্ত পরিমাণ না আসা, নতুন কলকারখানা নির্মাণ অশানুরূপ না হওয়া, স্বল্প ও মাঝারী ধরণের উদ্যোক্তা তৈরীতে কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন না হওয়াতে বেকারত্ব বাড়ছে বলে অভিজ্ঞমহল মনে করেন। তাছাড়া বর্তমান প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেক গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অনেক লোক বেকারত্বের মতো অভিশপ্ত জীবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তার হিসেব কে রাখে?

বিবিএস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে প্রায় ৪ কোটি মানুষ শ্রমশক্তির বাহিরে আছে। এর বেশীর ভাগই নারী। ৩ কোটি ৫২ লক্ষ নারী শ্রমশক্তির বাহিরে আছে। যা একটি দেশের জন্য বোঝা। এছাড়াও নতুন করে রোহিঙ্গা সমস্যা একটি বড় সমস্যা। যা বেকারত্বকে আরো বাড়িয়ে দিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে করে দেশের মূল অর্থনৈতিক ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, এতে কোন সন্দেহ নেই। আর এর সুদূর প্রসারী ক্ষতিকর প্রভাব বাংলাদেশকে বয়ে বেড়াতে হবে আরো বহু বছর। তা সহজেই অনুমেয়।

পরিশেষে, দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠিকে নিশ্চিত বেকার রেখে কখনো দেশের সার্বিক ঊন্নয়ন সম্ভব নয়। এব্যাপারে সরকার-এর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা থাকতে হবে। সরকার ও জনগণের কার্যকরী ভূমিকা বাড়াতে হবে। কর্মমূখী ও কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা’ই পারে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বেকারত্ব দূরীকরণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে। বিদেশে দক্ষ জনশক্তি রফতানি আরো বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে কুটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। ডিগ্রি অর্জন-কে শিক্ষার মূল লক্ষ্য না করে শিক্ষার গুণগতমান ও কর্মমূখী শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে নজর দিতে হবে। প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হলে বেকারত্ব অনেকাংশে কমে যাবে। কিশোর বয়স থেকে শিক্ষার পাশাপাশি কোন না কোন কাজ যেন প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীরা করতে পারে, সে পরিবেশ ও মনমানসিকতা তৈরী করতে হবে। কোন কাজই ছোট নয়, অভিভাবক ও শিক্ষকদের এবিষয়ে জ্ঞান রাখতে হবে এবং ইতিবাচক ভূমিকা রাখা জরুরী। উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত হতে না পারলে বেকারত্ব হ্রাস পাবে না। বেকারত্ব দূরীভূত না হলে সমাজে নানান রকমের সামাজিক চরম অস্থিরতা আরো বেড়ে যাবে। যা জাতীয় উন্নয়নকে বাঁধাগ্রস্ত করবে। আর তা কোন জাতির কাম্য হতে পারে না।

লেখক: আবুল খায়ের, কবি ও কলামিস্ট
          (khair.hrm@gmail.com)