nagorikkantha

দেশ যখন পরাধীন ছিল তখন সবাই নির্দিষ্ট একটা গোত্রে আবদ্ধ ছিল। সে সময় দেশের নেতা, কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবি, সাধারণ জনগণ একই সূতোয় গাঁথা ছিল। তাদের স্লোগান ছিল এক, দৃষ্টি-ভঙ্গি, দাবি-দাওয়া, চিন্তা-চেতনায় ছিল এক। আর সেটা ছিল নির্দিষ্ট একটা মানচিত্র, নির্দিষ্ট একটা পতাকা, নির্দিষ্ট একটা ভূ-খন্ডকে কেন্দ্র করে। আজ অমারা স্বাধীন হয়েছি। লাল সবুজের একটা পতাকা পেয়েছি। স্বাধীন একটা মানচিত্র পেয়েছি। অথচ আজ আমরা দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছি। বিভক্ত হয়ে পড়েছে পুরোটা মানচিত্র। এটা কখনোই আমাদের কাম্য ছিল না। বিভক্ত মনচিত্র একটা জাতীর জন্য কখনোই মঙ্গল জনক নয়। সাধারণ মানুষগুলোও আজ দলে দলে বিভক্ত। এখন আর মিলিত স্লোগানে, কাঁধে কাঁধ রেখে, সুরে সুর মিলিয়ে রাজপথ আলোকিত হয়ে উঠে না। এখন ভিন্ন ভিন্ন দাবি নিয়ে, ভিন্ন ভিন্ন স্লোগানে রাজপথ কেঁপে কেঁপে উঠে, ধ্বংসাত্মক দৃষ্টিতে পরিণত হয়। এখন আর দেশের নেতারা এক মঞ্চে এসে বসেন না। দেশের ভাবনায়, জনগণের ভাবনায় মিলিত সিদ্ধান্তে উপনিত হন না। এদের সকালের ঘুম ভাঙ্গে বিরোধীদের সমালোচনা, পরনিন্দা, ধ্বংসাত্মক, আক্রোমনাত্মক কথামালা দিয়ে। রাজনীতি এখন দেশ বাঁচানোর লড়াই নয়, রাজনীতি জনগনের অধিকার আদায়ের লড়াই নয়, দারিদ্রতা, বেকারত্ব দূর করণের লড়াই নয়। রাজনীতি এখন যেন হয়ে উঠেছে শুধুমাত্র এককেন্দ্রিক ক্ষমতার লড়াই। আজ নেতার বিরুদ্ধে নেতা কথা বলছে, ধর্মের বিরুদ্ধে ধর্ম কথা বলছে, বুদ্ধিজীবির বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবি কথা বলছে, লেখকের বিরুদ্ধে লেখক কথা বলছে। এ যেন একটা মানচিত্রের ভেতর হাজারটা মানচিত্র।

দেশে গণতন্ত্র বলে কিছু আছে ভাবতেই শিউরে উঠি। সর্বক্ষেত্রে রাজনীতিক নেতাদের ক্ষমতার দাপট। প্রশাসনিক কর্মকান্ডেও ভয়াবহ প্রভাব। চাকুরি নিতেও আজকাল নাকি দলীয় পরিচয়পত্রের বেশ মূল্যায়ন। কিছু কিছু তরুণদের প্রায়ই দেখা যায় দলীয় পরিচয়পত্রের পিছনে ছুটোছুটি করতে। ভাবতে অবাক লাগে, কষ্ট লাগে। আমি কিম্বা আমার মত অনেকেই সক্রিয় ভাবে কোন দলেয় সদস্য নয়। কোন রাজনীতিক দলের দালাল, কোন নেতা কিম্বা দেশের উর্ধতম কোন কর্মকর্মতার তোশামতধারী নয়। আমরা দেশকে ভালবাসি, দেশের মানুষকে ভালবাসি, আমরা শান্তি প্রিয়, আমরা সর্বদা দেশের শান্তি চাই। আজ দাঙ্গা-হাঙ্গামার নাম হয়ে উঠেছে রাজনীতি। জ¦ালাও-পোড়াও, গুম-খুনের নাম হয়ে উঠেছে রাজনীতি। আমাদের দেশের নেতারা যেন আমাদের জন্য নয়, দেশের জন্য নয়, দেশের জনগণের জন্য নয়। তাদের যত চেষ্টা, হাজারো কর্মসূচি, যেন নিজেদের ক্ষমতায় টিকে থাকার কর্মসূচি। এটা একটা যুদ্ধ, ক্ষমতায় টিকে থাকার যুদ্ধ, ক্ষমতা অর্জন করার যুদ্ধ। তাই যদি নাহত রাজনীতিকে কেন্দ্র করে রাজপথে গাড়ী ভাংচুর হত না, জ¦ালাও-পোড়াও, পুলিশের হাতে গ্রেফতারের মহাউৎসব চলতো না। নিজেদের মাঝে খুনোখুনির প্রতিযোগিতা হতো না।

এখানে কোন সেবক নেই, ক্ষমতার দাপটে এক একজন মহা ঘাতকে রুপান্তিত হয়ে উঠেছে। এই রাজনীতিকে কেন্দ্র করে কতজন বাবা-মা তাদের প্রিয় সন্তানদের হারালো, কতজন বোন বিধবা হল, কতজন লোক পঙ্গু হয়ে পরিবারের জন্য সমাজের জন্য বোঝায় রুপান্তরিত হল এর একটা সঠিক জরিপ প্রয়োজন। তবে বুঝা যাবে আমাদের দেশের বড় একটা সন্ত্রাস হচ্ছে দলে দলে বিভক্ত হওয়া আমাদের রাজনীতিক দলগুলোই। আমাদের দেশের প্রধান দুই নেতাকে যদি কখনো একমঞ্চে এনে দাঁড় করানো যায় তবে হয়তো এদের চেহারা, কথাবার্তা, আচরণ, বিভক্ত দুই মানচিত্রের মতই মনে হবে। হয়তো একজন আরেক জনকে দেখে বিষাক্ত সাপের মত ফোঁস ফোঁস করতে থাকবে। যদিও এদের দুইজনকে একমঞ্চে আনা হয়তো কখনই সম্ভব নয়। কেননা এরা রাজনীতিক নেতা, বিভক্ত হওয়া ভিন্ন ভিন্ন মানচিত্র। বাস্তবতা হল দেশে এখন আর কোন নেতা নেই। নেতা ছিল তখন যখন দেশ পরাধীন ছিল। নেতা ছিল তখন যখন কাঁধে-কাঁধ রেখে, জনতার হাতে হাত রেখে রাজপথে মুক্তির স্লোগানে আকাশ-বাতাস মুখরিত করত। আজ মানচিত্র বিভক্ত হয়ে গেছে। তাই আজ জনগণের বিরুদ্ধে জনগণ, শ্লোগানের বিরুদ্ধে শ্লোগান, প্রতিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, কলমের বিরুদ্ধে কলম কথা বলে। এটা একটা স্বাধীন দেশের জন্য লজ্জা জনক, দুঃখ জনক। এটা আমাদের কখনই কাম্য ছিল না। আমরা চাই সবাই এক মঞ্চে এসে দাঁড়াক। কাঁধে-কাঁধ রেখে, মিলিত সিদ্ধান্তে সবাই দেশের জন্য কাজ করুক, দেশের মানুষের জন্য কাজ করুক। তবেই দেশে শান্তি আসবে। উন্নয়ন হবে, দারিদ্রতা দূর হবে, বেকারত্ব মোচন হবে।

লেখক: কবীর হাসান, কবি ও সাংবাদিক, টাঙ্গাইল।
kabirhasanwww@gmail.com