nagorikkantha

রিক্সায় করে যাচ্ছি, রাস্তায় জ্যাম কিন্তু যানবাহন আস্তে আস্তে আগাচ্ছে। এক লেন পরেই একটা দামি গাড়িও এগোচ্ছে। মনে মনে চিন্তা করছি, আহা এই গাড়ি কি জীবনে কিনতে পারব! ঠিক তখনি গাড়ির সামনের বাম পাশের জানালাটা খুলে গেল, একটা ছেলে বড় একটা ফাস্ট ফুডের প্যাকেট (ঠোঙ্গা) জানালা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দিল এবং রাস্তায় পরেই সাথে সাথে প্যাকেটের ভিতরে থাকা অবশিষ্ট রাবিশ পরে জায়গাটা মাখামাখি হয়ে গেল। মনে তখন অন্য কথার উদয় হোল, “ওহে ছেলে তোমার গাড়ির টায়ারটাও যে ময়লা হয়ে গেল, তোমার বাবার দেয়া গাড়ির দরজায়ও কিন্তু একটু লেগেছে, ওটার কি হবে!!

- বাসের মধ্যে বসে আছি, জ্যাম চারিদিকে। হকার বাসে উঠে বলছে, এই পানি পানি, ঠাণ্ডা পানিইইই, লাগবেএএ ?? এক জনাব বললো, এই একটা পানি দেহ্। পানি কিনে পরিতৃপ্তির সাথে পান করে জনৈক জনাব সাঁ করে জানালা দিয়ে খালি বোতলটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন রাস্তায়।

- মোটা মুটি ধরনের রেসটুরেন্ট বা ক্যাফেতে প্রায়ই দেখা যায় তাঁদের ফ্লোর পরিষ্কার, কিন্তু টেবিলের পাসে দুমড়ানো টিসু পরে আছে। একটু বসে খেয়াল করলেই দেখতে পাবেন, খেতে আসা অতিথিরাই যাওয়ার সময় আস্তে করে মাটিতে ফেলে দিয়ে যান। টেবিলের উপর ফেলার ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও হাত মুছে নিচে ফেলে যাবেন। মানে এমন যে, টাকা দিয়ে খাইসিনা, ফ্লোর একটু মলা করলে কি হবে, আমারতো আর কিছু হবেন না। ভাই আপনি নিঃসন্দেহে পরিচ্ছন্ন কর্মীর গালি খান। মানুষের জায়গা বলে কি আপনার কোন দায়িত্ববোধ নাই।

- এক দোকানে বোতলের পানি খেয়ে বললাম, ভাই আপনার ডাস্টবিনে এটা ফেলে দেন। দোকানদার বোললো, ভাই সামনে ফিক্কা মারেন। আমি বলি, “বলেন কি ভাই! আপনার দোকানের সামনে-তো ময়লা হবে”। দোকানদার বলে, “আরে ভাই, ফেলেন-তো, একটু পরে টোকাই আইসা নিয়ে যাবে”। বাহ বাহ কি সুন্দর কথা; আমি বাকি ময়লাগুলা দেখায় বলি, আর ওইগুলা কে নিবে, ঐগুলা-তো মনে হয় আপনেই ফেলছেন। দোকানদার বলে, তাতে কি হইছে, থাউক। দোকানদার ভাই দোকানের সব ময়লা, প্যাকেট, কার্টুন, ইত্যাদি বসে বসে দোকানের সামনে ঢিল মারে। তাঁর চিন্তাধারা হচ্ছে, দোকান পরিষ্কার থাকলেই হইলো, সামনে যাই হোক।

- কাজিন এর সাথে রিক্সায় বসে আইসক্রিম খেয়ে প্যাকেটটা হাতে ধরে আছি, সামনে ডাস্টবিনে ফেলব বলে। ও হেসে বলে, আর এ, কি করে, ফেলে দেও রাস্তায়, কি হাতে ধরে আছ !!
- বন্ধুর সাথে রিক্সায় বসে যেতে যেতে সফট ড্রিকং খাচ্ছি, বন্ধু খাওয়া শেষে দিল ঢিল রাস্তায়। আমি বললাম, এটা কি হোল । বন্ধু বলে, এটাই আমাগো কালচার, তুই কি মঙ্গোল গ্রহ থেকে আসছিস নাকি !!

- একদিন একটা বড় বিজনেসের ডিরেক্টরের সাথে কথা বলছি এবং কথা প্রসঙ্গে এই বিষয়টা উঠেছিলো। আমি বলেছিলাম, আমি মানুষকে এটা শিখাতে চাই এবং আমাকে দিয়েই শুরু করবো প্রথমে (যেখানে সেখানে ময়লা ফেলা বন্ধ করাবো) । ওনার উত্তর ছিল, তুমি বন্ধ করতে পারবানা, আমিতো নিজেই ফেলি । আমি হতবাক হয়েছিলাম।
একজন সিনিয়র ইউনিভার্সিটি লেকচারার তাঁর নাতীর বর্ণনা দিচ্ছিলেন। “আমার পিচ্চি নাতি অনেক কনসাঁস । গাড়িতে করে স্কুল থেকে নিয়ে আসতেছি, মিমি কিনে দিয়েছিলাম, খাওয়া শেষে দেখি খালি প্যাকেটটা হাতে ধরে আছে, আমি হাত থেকে নিয়ে জানালা দিয়ে ফেলতে গেছি আর অমনি বলে ‘নানা’ কি করছো !! এটা অনেক খারাপ কাজ, ময়লা বিনে ফেলতে হয়, রাস্তায় ফেললে রাস্তা ময়লা হবে। আমাকে দাও, বাসায় গিয়ে ফেলব। কি আর বলবো, আমি স্তম্ভিত হয়ে গেছিলাম, আবার লজ্জাও পেয়েছিলাম। এই কাজটা নাতিকে আমার শিখানোর কথা, সেখানে নাতী আমাকে শেখাচ্ছে । পরে শুনেছি স্কুল থেকে শিখেছে এটা। ধন্যবাদ জানাই স্কুল কর্তৃপক্ষকে। আমি এখন থেকে না ফেলার চেষ্টা করি”।
এটা আসলে অল্প একটু সচেতনতার ব্যাপার । ছোটকাল থেকে স্কুলে শিখালেই হয়, আবার অফিসে এবং বাসায় একজন প্র্যাকটিস করা শুরু করলেই হয়। কয়দিন পরে এটাই নরমাল হয়ে যাবে।
জ্যাকি চ্যেং কে চিনেনা এমন মানুষ কমই আছে। তাঁর একটা সিনেমাতে দেখেছিলাম, সে খুব অগোছালো। তাই তাঁর মাস্টার ট্রেনিং হিসাবে সবচে আগে তাঁকে আদেশ দিয়েছিলেন, জ্যাকির নিজের জামাটাকে প্রতিদিন ঠিক জায়গায় রাখতে হবে। এর কিছুদিন পর জ্যাকি আবিষ্কার করে যে সে নিজে থেকেই কাপড় ঠিক জায়গায় রাখছে। ওঁটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে তাঁর জন্য।
প্রায় ৮০% বাসা বাড়ি, ফ্লাট বাড়ির ডানে বামে পিছে যদি দেখেন, দেখবেন সেখানে ময়লার স্তূপ হয়ে আছে। কিছু ময়লা ঝুলছে রেলিং এর সাথে। পাশে যদি এক তালা কোন বাসা/ দোকান পাট বা কিছু থাকে তাহলে দেখবেন সেই ছাদের উপর কত রকমের ময়লা, অপ্রীতিকর ময়লাও দেখা যায়। এর কারণ হচ্ছে, ঐ মানুষগুলো মনে করে জানালার বাহিরে মানে হচ্ছে ডাস্টবিন। যা ইচ্ছা ফেল । ফেলতে পারলেই হোল, নিজের বাসা পরিষ্কার থাকলেই হইলো । আড়ে ভাই, আপনার বাসার ঠিক বাহিরটাও আপনার এলাকার পরিবেশের মধ্যে পরে। আশেপাশে ময়লা হলে দুই দিন পর অন্য মানুষ সহ আপনি নিজেই নাক সিটকাবেন। আপনার জামার ভিতরে এবং বাহিরে দুই দিকেই আপনাকে পরিষ্কার রাখতে হবে। আপনি ফেলবেন-তো আপনার বাচ্চারাও শিখে এভাবেই ফেলবে। কিছু বললে বলবে, আমার আব্বা আম্মাকে দেখছি আমিও ফেলি। আপনার বাসার বেশির ভাগ কাজের মানুষগুলা এভাবে ময়লা ফেলে। বড় ছোট অনেক দৃষ্টিকটু রাবিশও ফেলে।
আপনি যদি বলেন রহিম করিম যদু মদু সবাইতো এইভাবেই ময়লা ফেলে, তাই আমিও করি তাহলে এটাই আপনার ভুল । আপনি নিজে শুরু করুন আর কিছু দিন পর আপনার পাশের বাসার মানুষকেও বলুন। ঢাকার সব জায়গাই মোটামুটি রাস্তার পাসে ডাস্টবিন করে দিয়েছে যা অনেক ভাল একটা পদক্ষেপ। আবার সেদিন দেখলাম কোন একটা কোম্পানি নিজেদের উদ্যোগে মানুষকে নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলার জন্য একটা বাস্কেট বল টাইপের ময়লার ডাস্টবিন তিরী করে দিয়েছে। একধরনের খেলার মতো ব্যাপারটা। তাঁদেরকে স্বাগত জানাই।
আপনার আশেপাশের অনেকেই বাসে, রিক্সায়, সিএনজি এইসব পাবলিক যানবাহনে চলাফেরা করে। আর অন্য দিকে আপনার অনেক টাকা আছে, ভাল উপার্জন করেন তাই গাড়িতে চলাফেরা করেন। এর মানে ৮০ টা মানুষ পাবলিক যানবাহনে চলাফেরা করলেও আপনি নিজের যানবাহনে চলাফেরা করেন। এর মানে সবাই যা করে তা আপনি করেন না। কিন্তু যদি আপনিও সাধারণ মানুষের মতো রাস্তায় মধ্যে বা যেখানে সেখানে ময়লা ফেলেন তাহলে আপনার সাথে আমার পার্থক্য কই রইল ।
সবাই করে, তাই আমিও করি; জি না, আসলে আপনি কিন্তু করেননা। আপনি সবসময় অন্যদের থেকে একটু আলাদা হতে চেষ্টা করেন। একই রকমের জামাকাপড় পরেননা, একই জিনিস ব্যাবহার করা থেকে একটুও পারলে সরে দাঁড়ান, একই বিল্ডিং এর বা একই পারার সবাই একই পারফিউম ব্যাবহার করেননা, তাহলে বাজে কাজটা কেন অনুকরণ করবেন, কেনো যত্র তত্র ময়লা ফেলবেন! আমি যদি বলি ভাই দেশটা আমার, আপনার না, আপনি ভাগেন এইখান থেকে, তখন কি বলবেন। হালুম করে উঠবেনা বলুন? আপনিও আমাকে এই কথা বললে, তখন আমি কি হা করে বসে থাকব, জি না, আমিও হালুম করে উঠবো। এইটা আমারও দেশ, যা খুশি তাই করবো তাতে আপনার কি। তাই বলে এমন কিছু করবো না, যাতে আমার দেশটা কোনো দোষে কলঙ্কিত না হয়। আপনাদের এলাকায় ময়লা, দুর্গন্ধ যেতে ভাল লাগে না, নাকে রুমাল দিয়ে যেতে হয়, শুনতে কেমন লাগবে !!
সব কিছু শুরু করতে হবে আপনার নিজের থেকেই এবং সেটা যদি আপনার সাধ্যের মধ্যে থাকে।

আশরাফুল ফেরদৌস
মিরপুর, ঢাকা