nagorikkantha

দেখতে অনেকটা ঔষধের শিশি/বোতল। সাধারণের বুঝার ক্ষমতা নাই যে, এটা কি আসলে জীবন রক্ষাকারী ঔষধ নাকি জীবন নাশকারী মাদক। বিক্রি করতে হয় গোপনে। ভারতে নাকি ঠান্ডাজনিত কাশির ঔষধ (!)। প্রকাশ্যে তা সকল ঔষধের দোকানে পাওয়া যায়। আর আমাদের দেশে সেটা নিষিদ্ধ এক ভয়াবহ মাদক, বিক্রি হয় গোপনে। ফেনসিডিল নামে পরিচিত হলেও মাদক সেবীদের কাছে এর আর এক নাম ‘ডাইল’। এই মাদকের ভয়াবহ করাল গ্রাসে আক্রান্ত আজ গোটা দেশ। এক সময় ৫০-১০০ টাকায় পাওয়া যেত। আর এখন ৮০০-১০০০ টাকা প্রতি বোতল। প্রথমে শখে বসে/বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে অনেক যুবক/কিশোর ফেনসিডিল-এর স্বাদ নিতে গিয়ে মাদকে আক্রান্ত হয়। একটু আধটু করে সেবন করতে করতে আস্তে আস্তে কখন যে পুরাপুরি নেশাগ্রস্ত হয়ে যায়। সে নিজেও বুঝতে পারে না। পরবর্তিতে শত চেষ্টা করলেও ছাড়তে পারে না। অনেক সম্ভাবনাময় তাজা প্রাণ ঝরে যাচ্ছে অকালে কিংবা অনেক মেধাবীকে জাতি হারাচ্ছে চিরতরে। দাম অপেক্ষকৃত বেশী হওয়ায় বিশেষ করে ধনী এবং অবস্থাসম্পন্ন ঘরের সন্তানদের মধ্যে এই মাদক সেবন বেশী লক্ষণীয়। আবার নিম্নমধ্যবিত্তের সন্তানদের ক্ষতি করছে বেশী। পরিবার থেকে টাকা না পেয়ে মাদক সেবনের টাকা যোগাড় করতে গিয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে।

ফেনসিডিল-একটি উত্তেজনা সৃষ্টিকারক ও নেশা জাতীয় হওয়ার সরকার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। একসাথে বেশি পরিমানে সেবন করলে মৃত্যুর কারণ হতে পারে। উঠতি কোমলমতি ছেলে-মেয়েরা এই মাদক সেবনের কোন ভালো কারণ বা উদ্দেশ্য সঠিকভাবে বলতে পারবেনা। শুধুমাত্র বাজে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে ঘোল্লায় যাওয়া ছাড়া আর কিছু নয়। ফেনসিডিল নেশাজাতীয় মাদক হলেও তরুনদের মধ্যে আজ অনেকটা কাংক্ষিত ও প্রয়োজনীয় উপভোগ্য উপাদান হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। যারা ক্লাশ ফাঁকি দেয়, বেকার, কোন না কোন সংঘঠনের সাথে জড়িত তাদের মধ্যেই এই মাদক বেশী প্রচলিত। কোন বিশেষ অনুষ্ঠান পালন, কোন কাজে সাফল্য অর্জন অথবা কোন বিশেষ দিবস’কে সামনে রেখে এই মাদকের ব্যবহার চলে সবচেয়ে বেশী। অনেকটা মদে’র বিকল্প বলা যায়। বন্ধুদের মধ্যে কে কতটা ‘ফেনসিডিল’ সেবন করলো, কে কি ধরনের মজা করতে পারল, সেটা বন্ধুদের মধ্যে বলতে পারাটাও একধরনের গর্বের বিষয়। আর এর ভয়ানক প্রবণতা ও অসুস্থ প্রতিযোগীতা যুবসমাজকে নিয়ে যাচ্ছে রসাতলে। নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি তরুনদের আর্কষণ থাকে একটু বেশী। কলেজ ফাঁকি দেয়া/বখাটে বন্ধুদের পাল্লায় পরে অনেকেই আজ ফেনসিডিল নেশায় আক্রান্ত। অনেকে পড়ালেখা নষ্ট হয়ে বিপথে চলে যাচ্ছে। মেধাবী ও ভদ্র ঘরের সন্তানদের অনেকে মেধাহীন হয়ে পড়া-লেখা ছেড়ে দিচ্ছে। ফিরে আসতে পারছেনা স¦াভাবিক জীবনে। ফেনসিডিল মাদকে যারা আক্রান্ত তারা পরিবারের সবার সাথেই রূঢ় আচরন করে। পরিবার ও সমাজকে কিছু দিতে না পারার কারণে দিন দিন হতাশাগ্রস্ত হয়ে যায়। স্বাভাবিক জীবন যাপন আর ভালো লাগেনা। এই মাদকের কবল থেকে বের হয়ে আসাও কঠিন। মাদকের প্রভাবে অনেক ভয়াবহ অপরাধের ঘটনার চিত্র প্রায়শই আমরা পত্রিকায় দেখি। মাদক থেকে ফিরে আনতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পূর্ণবাসন ব্যবস্থা। যেটা আমাদের দেশে খুবই অপ্রতুল। অনেক ব্যয়বহুলও বটে। চিকিৎসা ব্যবস্থা ধনী পরিবারের সমস্যা না হলেও মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এক ভয়ানক অভিশাপ ছাড়া আর কিছু নয়।

দিন দিন ভয়াবহ এই মাদকের ব্যবসা এখন সর্বোত্র জমজমাট আকার ধারণ করছে। ক্ষমতাসীন প্রভাবশালী কিছু লোক ছাড়াও প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তি এই মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত বলে পত্রিকার খবরে দেখা যায়। সীমান্তের ওপারে অর্থাৎ ভারত ও মায়ানমার সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে এই মাদক। সকল স্থলবন্দর ছাড়াও সবচেয়ে বেশী প্রবেশ করে দিনাজপুর হিলি বর্ডার দিয়ে। সীমান্তের অতি নিকটেই এইসব ফেনসিডিল তৈরীর কারখানা স্থাপন করা হয়েছে বলে পত্রিকায় প্রকাশ। ভারত/মায়ানমার সরকার যেন পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশে বাজারজাত করার জন্যই এইসব কারখানা স্থাপন করেছে। আর সেটা চলছে অন্য দশটা বৈধ পণ্যের মতো। তবে সেটা টপ সিক্রেট। কারো যেন কোন মাথা ব্যথা নেই।

কিছু অসাধু ও অর্থলোভী প্রশাসনের যোগসাজসে চলছে এই রমরমা ব্যবসা। দেখার যেন কেউই নেই। যদিও মাঝে মাঝে দেখা যায়, প্রশাসন কিছু কিছু বড় বড় চালান আটক করেছে। উদ্ধারকৃত ফেনসিডিল বুলডোজার দিয়ে প্রকাশ্যে নস্ট করতেও দেখা যায়। কিছু লোককে গ্রেফতারও করা হয়। তবে প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত। অপরাধীরা গ্রেফতার হয়। কিন্তু বেশী দিন আটকিয়ে রাখা যায় না। জামিনে বের হয়ে এসেই ফের ব্যবসার জড়িয়ে পড়ে। বেকার যুবক ও অনেক ভালো ছেলেরাও না বুঝে খুব দ্রুত বড়লোক হওয়ার আশায় এই ভয়াবহ ক্ষতিকারক মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে সর্বশান্ত হচ্ছে। অনেকে সাজানো গোছানো সুখের সংসার নষ্ট করছে। আবার অনেকে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে বাকিটা জীবন কারাগারেই কাটাচ্ছেন এমন নজিরও আছে ঢের।

‘ফেনসিডিল’ ব্যবসার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার জন্য প্রশাসনকে নির্দেশনাও দেয়া আছে। সকল ধরনের মাদক-এর বিরুদ্ধে সর্বস্তরে সক্রিয় আছে প্রশাসন। কিন্তু ফেনসিডিল ব্যবসার বাজারজাতকরণ কোন ভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না। সীমান্তের ওপার থেকে চোরাচালান ছাড়াও বর্তমানে দেশীয় প্রযুক্তিতে বাসা বাড়ীতেই তৈরী হচ্ছে নকল ফেনসিডিল। কিছু লোক অতি নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বীরদর্পে। ছোট বোতল। ঔষধের সিরাপ মনে হয়। সন্দেহ করাও কঠিন। যাত্রীবাহী বাসে, মাক্রোবাসে মৌসুমী ফলের বস্তার ভিতর, সবজির ট্রাকে, কাঁঠাল/তরমুজের ভিতর ইত্যাদি মাধ্যমে ফেনসিডিল পাচার করার কারণে প্রশাসনের পক্ষে সহজে ধরাও মুশকিল।

মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স-এর ঘোষণা করা আছে। সেভাবে প্রশাসনকে তৎপর হলে এই ব্যবসা কখনো এতটা ভয়াবহরূপ নিতো না-বলে অভিজ্ঞমহল মনে করেন। দেশে প্রায় ৪০ লক্ষ লোক কোন না কোন মাদকে আসক্ত। তার মধ্যে একটা বড় অংশ ফেনসিডিল-এ আসক্ত। ফেনসিডিল ব্যবসা রোধকল্পে সরকারী ও বেসরকারীভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে জোরালোভাবে। বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষকদেরও ভূমিকা রাখতে হবে। সীমান্তে আরো কঠোর হতে হবে বর্ডারগার্ড জোয়ানদের। সীমান্তের কাছাকাছি ফেনসিডিল তৈরীর কারখানা বন্ধ করার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে এবং কুটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে তিব্র প্রতিবাদ জানাতে হবে। সরকার প্রধানদের মধ্যে বৈঠক ও আলোচনার মাধ্যমে এর একটা বিহীত ও আশু সমাধান বের করা উচিত। তা না হলে দিন দিন ফেনসিডিল-এর উৎপাদন বাড়তেই থাকবে। শত চেষ্টা করেও এই মাদকের বাজারজাতকরণ রোধ, পাচার ও সেবনের হার কমানো যাবে না।

শিক্ষার্থী/সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে-শিক্ষক/অভিভাবকদের। ছেলে-মেয়েরা কোথায় যায়, কাদের সাথে মিশতেছে-খোঁজ খবর রাখতে হবে প্রতিনিয়ত। টাকা পয়সা কি কাজে ব্যয় করছে, সময় কিভাবে কাটাচ্ছে সেটাও দেখতে হবে। পরিবারের সকলের সাথে নিবিড় সম্পর্কই পারে যেকোন হতাশা থেকে ছেলে-মেয়েদের মুক্তি দিতে। নয়তো দিন দিন ফেনসিডিল-এর করাল গ্রাসে যুবসমাজ ধ্বংসের ধারপ্রান্তে চলে যাবে। মেধাহীন ও বুদ্ধিমত্তাহীন অর্কমণ্য যুবসমাজ-কে জাতি বয়ে বেড়াবে বোঝা হিসেবে। দীর্ঘদিন এর ক্ষতিকর প্রভাব থাকবে সমাজে। স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে হলে মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা জরুরী। মাদক নিয়ন্ত্রণে নাগরিক সচেতনার কোন বিকল্প নেই। আসুন সবাই মিলে কার্যকরভাবে ফেনসিডিল’সহ সকল প্রকার মাদকের হাত থেকে সমাজ ও দেশকে বাঁচাতে এগিয়ে আসি। মাদকমুক্ত আদর্শ সমাজ গঠনে নিজেকে আত্মনিয়োগ করতে হবে। তবেই দেশ ও জাতি পাবে শান্তির সুবাতাস।

-আবুল খায়ের
কবি, কলামিস্ট ও ঊন্নয়ন কর্মী;