nagorikkantha

সারা দুনিয়াতেই মার্কেটিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে পড়ান হয়। একাডেমিক ডিসিপ্লিন হিসেবে আমেরিকায় বা পাশ্চাত্য দেশগুলোতে ৮০ বছর এবং বাংলাদেশে প্রায় ৪০ বছর ধরে মার্কেটিং পড়ান হয়। মার্কেটিং যেহেতু ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই ব্যবসায় অনুষদেই বিষয়টি পড়ান হয়।

সাধারণত পণ্য বিক্রি করার যে কৌশল সেটাকে আমরা মার্কেটিং বা বাজারজাতকরণ বলি। অর্থাত্ পণ্য সামগ্রী উত্পাদন কাস্টমারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আগে পরে যে কাজগুলো রয়েছে তাই মার্কেটিং। কিন্তু এখন আর বিষয়টি ওই গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বলা হয়, মার্কেটিং এখন ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা এবং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাও এখন মার্কেটিং। সেই অর্থে সরাসরি আমরা যাদেরকে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বলি, যারা পণ্য বেচা কেনা করে বা সেবা বেচা কেনা করে এর বাইরেও বহু প্রতিষ্ঠান এখন মার্কেটিংয়ের কৌশল প্রযুক্তি এবং দর্শনকে ব্যবহার করছে। এক সময় মনে করা হতো সাবান, শ্যাম্পু, কোকাকোলা এগুলো উত্পাদন এবং বিক্রির সঙ্গে মার্কেটিং জড়িত। কিন্তু এখন তা বলা হয় না। ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব, সামাজিক সমস্যা, যেমন নারী নির্যাতন, পরিবেশ দূষণ, শিশু-কিশোরদের অধিকার এবং জলবায়ু পরিবর্তন, আবহাওয়া পরিবর্তন এ সবগুলোই এখন মার্কেটিংয়ের বিষয়।

ছোট একটা উদাহরণ দেওয়া যায়, সেনাবাহিনীও আজকাল বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। কারণ, তারা চায় মেধাবী ছেলেরা সেনাবাহিনীতে যোগ দিক। এটাও আসলে মার্কেটিং। যেখানে মানুষ মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত হবে এবং প্রভাবিত করবে, উদ্বুদ্ধ করবে এবং প্ররোচিত করবে, তখন আমরা বলব এটার সঙ্গে মার্কেটিং জড়িত। মার্কেটিং শুধু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের জন্যই নয়, অব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, সরকারি প্রতিষ্ঠান, পুলিশ বাহিনী থেকে আরম্ভ করে আমাদের সমাজের অসংখ্য সামাজিক রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। যেমন, ইলেকশনের সময় রাজনৈতিক দল দলীয় প্রার্থীর জন্য ক্যাম্পেইন করে এটাও মার্কেটিং। মার্কেটিংয়ের চারটি হাতিয়ার আছে, এগুলো হলো: প্রোডাক্ট, প্রাইস, প্লেস এবং প্রমোশন। এই হাতিয়ারগুলো এখন সবাই ব্যবহার করছে।

প্রযুক্তিগত উন্নতির কারণে খুব সহজে এখন প্রোডাকশনের পরিমাণ বাড়ান যায়। টেকনোলজি এত দ্রুত গতিসম্পন্ন যে, খুব সহজেই পণ্য উত্পাদন করা সম্ভব। কিন্তু প্রোডাক্ট বিক্রি করা এত সহজ নয়। কারণ মানুষের মন পাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত তাকে ধরে রাখা কেবল উন্নত প্রযুক্তি অথবা যন্ত্রপাতি দিয়ে হয় না। এখানে হিউম্যান রিসোর্স দরকার, দরকার দক্ষ জনশক্তি, যারা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করবে এবং মেইনটেইন করবে। আমরা তো প্রফিটের কথা বলি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই প্রফিট করতে হবে। অন্যান্য সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানও প্রফিটের কথা চিন্তা করে। যদিও আমরা এগুলোকে ননপ্রফিটেবল অর্গানাইজেশন বলি তারপরও এদের একটি সামাজিক লক্ষ্য আছে, উদ্দেশ্য আছে। লাভই হোক বা উদ্দেশ্য অর্জনই হোক, যেটিই আমরা করতে চাই না কেনো এটার একটা সফলতা থাকা লাগবে যার জন্য মানুষকে আকর্ষণ করার একটা ক্ষমতা থাকা চাই। আর সেটা কোনো যন্ত্র দিয়ে করা যায় না। প্রযুক্তির উত্কর্ষের কারণে প্রোডাকশনে শ্রমিক কম লাগলেও মার্কেটিংয়ে লোক বেশি লাগছে। অর্থাত্ একদিকে প্রযুক্তিগত কারণে শ্রমশক্তি কম লাগছে, অন্যদিকে এগুলো বিক্রির জন্য মার্কেটিংয়ে আরো বেশি লোক লাগছে। কোম্পানির হিসাব নিকাশ সফটওয়ার ব্যবহার করে করা গেলেও মানুষকে প্ররোচিত করে, উদ্বুদ্ধ করে প্রোডাক্টটা কেনা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত তাকে স্থায়ী ক্রেতায় রূপান্তর করা এটা কোনো মেশিনপত্র দিয়ে করা যায় না। যার কারণে দেখা যাচ্ছে, এক্ষেত্রে হিউম্যান রিসোর্সের ডিমান্ডটা আরো বেড়েছে।

কোনো অর্থনীতি যত গ্রো করবে, সাইজ যত বড় হবে তখন ক্রমান্বয়ে একটা সার্ভিস অর্থনীতিতে পরিণত হবে। যেখানে প্রোডাকশনে কাজের লোকের পরিমাণ কমে যাবে আর সার্ভিস এবং অন্যান্য কাজগুলো যেমন, বিক্রি এবং ক্রেতা সন্তুষ্টির জন্য আফটার সেলস সার্ভিস দেওয়া, সাপোর্ট দেওয়া এই কাজগুলোর গুরুত্ব বেড়ে যাবে। যার কারণে যে অর্থনীতি যত উন্নত হবে সেই অর্থনীতিতে মার্কেটিংয়ের গুরুত্ব তত বেশি বেড়ে যাবে।

আমি বলব না মার্কেটিং পেশায় সফল হতে হলে মার্কেটিং পড়ার কোনো দরকার নাই। যদিও পৃথিবীতে যত লোক মার্কেটার হিসাবে সবচেয়ে সফল তারা কোনদিন মার্কেটিং পড়েন নাই। ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ, এমবিএ পড়েন নাই। বিল গেটস্ ভর্তি হয়েছিলেন এমবিএতে। পড়েন নাই। দুই সেমিস্টার পড়ে চলে গেছেন। তাঁর চেয়ে বড় মার্কেটার তো আর দুনিয়াতে নাই। আমাদের আবুল হাশেম, পার্টেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান, আমাদের মোস্তফা কামাল, মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান, প্রত্যেকে প্রায় ৪০টা করে কোম্পানির মালিক। মার্কেটিং পড়া তো দূরের কথা, ইউভার্সিটির ধারেকাছেও আসেন নাই। অতএব মার্কেটিংয়ে সফল হওয়ার জন্য বাজারকে বুঝতে পারা এবং মানুষকে বুঝতে পারার ক্ষমতা থাকলেই হয়। কাস্টমাররা কী চায় এটা যদি কোনোভাবে অনুধাবন করতে পারা যায়, তাহলে মার্কেটিং করতে আর কোনো সমস্যা হবে না। কাস্টমারের প্রয়োজন বুঝে প্রোডাক্ট তৈরি করলে তখন আর বিক্রির সমস্যা হয় না। তবে আগেকার দিনের যাদের উদাহরণ দিলাম আবুল হাশেম, মোস্তফা কামাল, তাদের দিনটা আর এখনকার দিনটা এক নয়। বাস্তবতা হচ্ছে এখন অনেক ধরনের আইন কানুন, কমপ্লায়েন্সের বিষয়গুলো চলে এসেছে। এরপর প্রযুক্তির বিষয় চলে এসেছে। অনেক সায়েন্টিফিক গবেষণার বিষয় চলে এসেছে। এই ক্ষেত্রগুলোতে একাডেমিক জ্ঞানটা লাগে। আগে যারা কোম্পানি তৈরি করত তারা শুধু উদ্যোক্তা ছিলেন। আর যারা এমবিএ বিবিএ পাস করে চাকরি করত তারা স্রেফ ফর্মুলা প্রয়োগ করত। কিন্তু এখন আর এটা কাজে আসছে না। তাদেরও উদ্যোক্তার মত আচরণ করতে হবে। তাদেরকে এ রিক্স নিতে হবে এবং কাস্টমারকে বোঝার জন্য তাদের সঙ্গে মিশতে হবে। ব্যবসায় প্রসার বাড়ার কারণে, প্রতিযোগিতা বাড়ার কারণে যখন তীব্র প্রতিযোগিতার যুগ আসছে তখন আবার না পড়া লোকগুলো যারা সফল হয়েছে, তারা এককভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবে না। উদ্যোক্তার বুদ্ধি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ফর্মুলা পড়ান হয় এই দুইটার যখন সম্মেলন ঘটে তখনই কোম্পানিটা দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে। অতএব মার্কেটিং পড়ার গুরুত্ব তো আছেই।

আমি প্রায়শ বলি মার্কেটিংয়ে সফল হতে হলে সমাধান না খুঁজে সমস্যা খোঁজা উচিত। আমাদের এখানে যেটা হয় প্রায় সময়ই সমাধানটার উপর বেশি জোর দেওয়া হয়। যেমন মশারি একটা সমাধান। এটা কোনো সমস্যা নয়। মশারি তো মশার কামড় থেকে পরিত্রাণের একটা উপায়। যখনই আমরা সমস্যাটাকে বিশ্লেষণ করব, তখনই দেখব বিদ্যমান যে পণ্যটা আছে তার চেয়ে আরো ভালো সমাধান হয়ত আমার মাথায় চলে আসতে পারে। মশারিকে যদি আরো উন্নত করতে চাই তাহলে এক সময় মশারির ভিতর বাতাস ঢুকাই বন্ধ হয়ে যাবে। মশা কিন্তু ঢুকবেই। কারণ মশারও বুদ্ধি আছে। আমি যেটা বলতে চাই, মশার উপদ্রব থেকে রক্ষার জন্য এখন অনেক কিছু বেরিয়েছে, গুডনাইট লিকুইড বেরিয়েছে, ভাইব্রেশন বেরিয়েছে, এমন ভাইব্রেশন যা মানুষের কানে আসবে না কিন্তু কোনো মশা থাকতে পারবে না। ইঁদুর মারা কলটা নিয়ে গবেষণা না করে ইঁদুরের উপদ্রব নিয়ে গবেষণা করলেই দেখা যাবে, আরো নানা সমাধান বের হয়ে আসছে। যেমন, একটা বাড়ীতে একটা বিড়াল পাললেই তো হয়। এজন্য প্রত্যেকটা প্রোডাক্টকে বলা হয় সলিউশন। তাই প্রবলেমটাকে যত বেশি গবেষণা করা হবে অল্টারনেটিভ সমাধান বের হয়ে আসবে।

একটা সময় প্রডাক্ট, প্রাইস, প্লেস, প্রমোশন এই ৪টা মৌলিক উপাদান নিয়ে মার্কেটিং কাজ করত। একটা যুতসই প্রোডাক্ট বের করতে হবে, এমন মূল্য নির্ধারণ করতে হবে, যা মানুষ খরচ করতে পারবে, সহজে মানুষ পায়, তার ব্যবস্থা করতে হবে এবং প্রচার প্রচারণা করতে হবে। এই ৪ ‘পি’ যেটা ছিল, সেটা পরবর্তী পর্যায়ে কটলার এবং তাঁর সহযোগীরা এসে বললেন, এটা তো কোম্পানির দিক থেকে বলা হয়েছে, কাস্টমারের দিক থেকে চিন্তা করলে তখন হয় ফোর ‘সি’। এটা হলো কাস্টমার সলিউশন, কস্ট, কনভেনিয়েন্স এবং কমিউনিকেশন। এখন আরো অ্যাডভান্স লেবেলের চিন্তা করা হচ্ছে। জগদিশ শেঠ এবং তার সহযোগীরা বলছেন, এর চেয়ে আরো ভালো হয়, ফোর ‘সি’ না বলে ফোর ‘এ’ বলা হয়। ফোর ‘এ’ হলো-এক্সেপটিবিলিটি সমাধানটি ভোক্তার নিকট গ্রহণযোগ্য হতে হবে। যেটাকে মূল্য আমরা বলি সেটা হতে হবে এফোরডেবেলিটি। অর্থাত্ এটা ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকতে হবে। এক্সেসিবিলিটি অর্থাত্ মানুষ যেন সহজেই এটার কাছে পৌঁছাতে পারে। ডেলিভারি থেকে আরম্ভ করে পেমেন্ট পর্যন্ত সুবিধা থাকতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশেই আগামী ১০ বছর পরে মানুষ দোকানে যাবে না। সবাই অনলাইন নির্ভর হয়ে যাবে। সবশেষে থাকে কেবল ক্রেতাকে ‘অবহিত’ করা বা ‘এওয়্যারনেস’।

আমরা বলি সবাইকে মার্কেটিং পড়ানর দরকার নাই। তবে ব্যবসায় অনুষদের যে কোনো সাবজেক্টে পড়তে চাইলে অবশ্যই মার্কেটিং লাগবে। তাদের মার্কেটিংয়ের ন্যূনতম জ্ঞান থাকতে হবে।

-অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান
উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়