nagorikkanthanagorikkantha

নিউইয়র্কের একটি সাবওয়ে গাড়িতে যাত্রীরা জনভোগান্তি ও ভঙ্গুর দশার জন্য চলতি বছর বারবার শিরোনাম হয়েছে নিউইয়র্কের পাতাল রেল বা সাবওয়ে ব্যবস্থা। নিউইয়র্কের বর্তমান প্রশাসনকে এ জন্য শুনতে হয়েছে ব্যাপক সমালোচনা। কিন্তু আজকের দুরবস্থা একদিনে হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে হওয়া বহু ভুল ও বাজে সিদ্ধান্তের ফলেই আজকের এই অবস্থায় এসেছে নিউইয়র্কের পাতাল রেল ব্যবস্থায়।

ব্রুকলিনের দক্ষিণাঞ্চলে ব্যস্ত সময়ে লাইনচ্যুত হয়ে আতঙ্ক ছড়ানো কিউ ট্রেন, নয়জনকে হাসপাতালে পাঠানো আপার ম্যানহাটনের রেললাইনের আগুন কিংবা ডাউনটাউন টানেলে হঠাৎ আটকা পড়া এফ ট্রেন; এসবই চলতি বছরের নিউইয়র্কের পাতাল রেলে জনভোগান্তির চিত্র, সঙ্গে রয়েছে ব্যস্ততম মুহূর্তে নির্ধারিত ট্রেনের বিলম্বের মতো নিয়মিত বিষয়। এটিই চরম মাত্রা পায় গত জুনে, যখন আরেকটি লাইনচ্যুতির ঘটনায় ৩৪ জন আহত হয়। ওই ঘটনায় নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমো সাবওয়ে সিস্টেমের ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেন। এরই সূত্র ধরে প্রথমবারের মতো নিউইয়র্ক সাবওয়ে ব্যবস্থার সমস্যা নিরূপণে তদন্ত হয়। বেরিয়ে আসে বহুবিধ সমস্যা।

কিন্তু এসব সমস্যা বন্যা কিংবা ঝড়ের মতো হঠাৎ এসে নিউইয়র্কে হাজির হয়নি। বহু বছর ধরে এগুলো একটু একটু করে তৈরি হয়েছে। নীতিমালা প্রণেতারা রেলযাত্রীদের কথা বিবেচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা নিলে আজকের বহু সমস্যার অনেকই এড়ানো যেত।

নিউইয়র্ক টাইমস–এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অতিরিক্ত ভিড়ে পর্যুদস্ত বুড়ো সাবওয়ে ব্যবস্থা যখন সংস্কার দাবি করছে, তখন নিউইয়র্ক শহর ও অঙ্গরাজ্যের রাজনীতিক ও নীতিনির্ধারকেরা এদিকে নজরই দেননি। বরং এ বাবদ ব্যয় সংকোচন করে অর্থ লগ্নি করেছেন অন্য সব চিত্তাকর্ষক খাতে। শতবর্ষী টানেল ও রেলপথ যখন ভেঙে পড়ছে, তখনো মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্টেশন অথোরিটি (এমটিএ) সাবওয়ের সংস্কার বাজেট বাড়ায়নি। বরং ২৫ বছর আগের হারেই বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে। অথচ এর মধ্যে মুদ্রাস্ফীতি ঘটে গেছে বহুবার। পর্যাপ্ত অর্থ নেই—এই অজুহাতে এক দশকের ব্যবধানে শত শত মেকানিকের পদ বাতিল করা হয়েছে। অথচ একই সময়ে সাবওয়ে ব্যবস্থাপকদের জন্য ক্ষতিপূরণ বাবদ বার্ষিক ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৩ লাখ ডলার।

দুই দশকে নিউইয়র্ক সাবওয়েতে যাত্রী সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে বর্তমানে ৫৭ লাখে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বিশ্বের বড় শহরগুলোর মধ্যে একমাত্র নিউইয়র্কেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে রেললাইন কমেছে। এ লাইন সম্প্রসারণের উদ্যোগ বিভিন্ন সময়ে নেওয়া হলেও বেসরকারি কন্ট্রাক্টর ও শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তির শর্ত পূরণ করতে না পারায় তা কখনোই আলোর মুখ দেখেনি। এসবের কারণেই বিশ্বের শীর্ষ ২০ গণপরিবহন ব্যবস্থার (এমআরটি) মধ্যে নিউইয়র্কের রেললাইন সবচেয়ে খারাপ। বর্তমানে এ সাবওয়ে ব্যবস্থায় মাত্র ৬৫ শতাংশ ট্রেন নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছায়। এ পরিণতির জন্য দায়ী দুই দশকে নিউইয়র্ক শহর ও অঙ্গরাজ্যের দায়িত্বে আসা ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান রাজনীতিকেরা। জর্জ ই প্যাটাকি থেকে অ্যান্ড্রু কুমো এবং গুইলিয়ানি থেকে ব্লাজিও; সবাই নিজেদের অগ্রাধিকারকে মূল্য দিতে গিয়ে সাবওয়ের বাজেটকে সংকুচিত করেছেন। সম্মিলিতভাবে তাঁরা সবাই কর, আইটি চার্জ, পরামর্শ ফিসহ নানান অজুহাতে সাবওয়ের বাজেট থেকে সরিয়েছেন ১৫০ কোটি ডলারের বেশি। প্রথম আঘাতটি আসে গুইলিয়ানির কাছ থেকে, এমটিএর বাজেট থেকে ৪০ কোটি ডলার কমিয়ে। তাঁর উত্তরসূরি মাইকেল ব্লুমবার্গ মুদ্রাস্ফীতিকে বিবেচনায় না নিয়ে এ বাজেটকে রেখে দেন আগের মাপেই। ডি ব্লাজিও ২৫০ কোটি ডলারের তহবিলের প্রতিশ্রুতি দিলেও ভর্তুকির বিষয়টি এড়িয়ে যান।

নিউইয়র্কের এই কর্তাব্যক্তিরা এমটিএকে বাধ্য করেছেন এর বিভিন্ন স্টেশনের সজ্জার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে, যা সেবা ও যাত্রী সাধারণের আস্থার নবায়ন করতে পারেনি। বাইরের চাকচিক্য বাড়াতে গিয়ে সাবওয়ের সিগন্যাল পদ্ধতিকে ফেলে রাখা হয়েছে ১৯৩০–এর দশকের সাবেকি অবস্থায়। অ্যান্ড্রু কুমোর পরামর্শে সিগন্যাল বাবদ এমটিএর বাজেট কমানো হয়েছে ৫০ কোটি ডলার। একই সঙ্গে এমটিএকে তাঁরা বাধ্য করেছেন বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ নিতে, যা শোধ করা সংস্থাটির পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এর কিস্তি পরিশোধ বাবদ বর্তমানে এমটিএর বাজেটের প্রায় ১৭ শতাংশই ব্যয় হয়।

এমন অজস্র উদাহরণ দেওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের মালিকানাধীন তিনটি স্কি রিসোর্টকে দেউলিয়ার হাত থেকে বাঁচাতে ৫০ লাখ ডলার দিতে কুমো প্রশাসনের এমটিএকে বাধ্য করার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এ ছাড়া এমটিএর কাছ থেকে প্রশাসনে থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তির সুবিধা নেওয়ার বিষয় রয়েছে। রয়েছে নির্মাণ কোম্পানি ও ইউনিয়নের চাপে বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ব্যয়ে এমটিএকে বাধ্য করার বিষয়।

নিউইয়র্ক শহরের অর্থনৈতিক উন্নয়ন করপোরেশনের সাবেক প্রধান সেথ ডব্লিউ পিনস্কি বলেন, সাবওয়ের উন্নয়ন ও সংস্কারের বাইরে এমটিএ বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়, যা খুবই দুঃখজনক। আর এটিই এখানকার সবচেয়ে বড় সমস্যা।

নিউইয়র্ক টাইমস–এর প্রতিবেদনে অন্যতম সমস্যা হিসেবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কথা বলা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমটির মতে, এমটিএর উঁচু পদে এমন অনেকেই রয়েছেন, যাঁদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ বিভিন্ন কোম্পানির সরাসরি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। উচ্চ বেতনভুক্ত এসব ব্যক্তি আবার সময়োপযোগী বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও জটিলতার সৃষ্টি করেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন সংস্কারকাজে অধিক ব্যয়েও তাঁরা বাধ্য করেন এমটিএকে।

এটি সত্য, ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলা, ঘূর্ণিঝড় স্যান্ডির আঘাতসহ বিভিন্ন ভয়াবহ দুর্যোগেও নিউইয়র্ক শহরের সাবওয়ে তার সেবা দিয়ে অবিচল থেকেছে। কিন্তু এসবের মধ্য দিয়ে একটু একটু করে ভেতরে ক্ষয়ে গেছে এ ব্যবস্থা, যা নবায়নে ও সংস্কারে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

সম্প্রতি কুমো জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর চটজলদি একটি ৮০ কোটি ডলারের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু এর ভবিষ্যৎ অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করছে। এর মধ্যে শুরুতেই রয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি, যা নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী হতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কারণ, কয়েক দশক ধরে শহর ও অঙ্গরাজ্যের মহাহিসাব নিরীক্ষকের কাছ থেকে ক্রমাগত সতর্কতা শুনেও তাতে বিন্দুমাত্র গা করেননি গদিনশিন রাজনীতিকেরা। ২০০৮ সালে তাঁরা মূল্য নির্ধারণ পরিকল্পনা পাসে ব্যর্থ হয়েছেন। আর্থিক সংকটের মুখে তাঁরা ব্যাংকের সঙ্গে এমটিএর সমঝোতা প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেছেন। সাবওয়ে নিয়ে এমটিএ, ট্রান্সপোর্টেশন রিইনভেনশন কমিশন, ২০১৪ সালে বিশ্বের পরিবহন বিশেষজ্ঞদের দেওয়া প্রতিবেদন; এর কোনোটিকেই গ্রাহ্য করেননি। এসবই আড়াল করা হয়েছে জনগণ থেকে।

এসবেরই ফলে কয়েক দশকের মতো প্রথমবারের মতো গত বছর সাবওয়ে ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমেছে। এ বিষয়ে পরিবহন বিভাগের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডেভিড এল গান বলেন, ‘এটি ভয়াবহ। এমনকি বিষয়টি আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছে।’ ১৯৭০ সালের দুর্যোগ থেকে পরিবহন ব্যবস্থাকে রক্ষা করা এ নেতা বলেন, ‘এসব দেখে আমি হতবুদ্ধি হয়ে যাচ্ছি।’

বর্তমান সাবওয়ে ব্যবস্থার মূল নিয়ন্ত্রক অ্যান্ড্রু কুমো। সম্প্রতি জরুরি অবস্থা ঘোষণার মাধ্যমে এমটিএর জন্য তিনি বাড়তি ৮০০ মিলিয়ন ডলার তহবিল ঘোষণা করেছেন। এ অর্থ ব্যয়ের বিষয়টিও তিনিই নিয়ন্ত্রণ করছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ২০২০ সালের ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য এ প্রেসিডেন্ট প্রার্থী এর নিয়ন্ত্রণ থেকে সরে দাঁড়ালেই বরং ভালো করবেন। বরং তিনি সাবওয়ের মূলগত সংস্কার সম্পন্নের লক্ষ্যে একটি আইন পাস করলে তা পুরো কার্যক্রমের জন্য অনেক বেশি সহায়ক হবে।

এ বিষয়ে কুমোর মুখপাত্র ড্যানি লিভার বলেন, সীমিত সম্পদ ও দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা দিয়েই পরিবহন নেতা ও রাজনীতিকেরা এমটিএর উন্নয়নে আন্তরিক।

২৯ নভেম্বর, ২০১৭ ১৪:০৫ পি.এম