nagorikkanthanagorikkantha

ভোলার চরফ্যাশনে আসামী-পুলিশের পাতানো ফাঁদে পড়ে কন্যা হত্যার বিচার নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন বিচারপ্রার্থী এক বাবা। মামলা প্রত্যাহারে পুলিশ ও আসামী পক্ষের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ায় তার এক ছেলেকে মিথ্যা মাদক মামলায় জেলে পাঠানোর অভিযোগ করেছেন। আসামী পক্ষ বিত্তশালী হওয়ায় ধর্ষণ ও খুনের মামলার আসামী মিজানুর রহমানের পক্ষ হয়ে স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী নানা অপকর্ম করছে।

অভিযোগে জানা যায়, ধর্ষণ মামলা থেকে বাঁচতে চরফ্যাশন পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের মৃত হাজি আবদুল হকের ছেলে কোটিপতি ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান শশীভূষণ গ্রামের আব্দুল মান্নানের মেয়ে কহিনুর আক্তার সাথীকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর পরই কৌশলী মিজানুর রহমান কহিনুর আক্তার সাথীর সঞ্চিত ১৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। সর্বস্ব হাতিয়ে নেয়ার পর যৌতুকের জন্য নিত্যনির্যাতনের পর মিজানুর রহমান স্ত্রী কহিনুর আক্তার সাথীকে খুন করে লাশ গুম করে। এ ঘটনায় সাথীর বাবা আবদুল মান্নান বাদি হয়ে ভোলা জাজ কোটে মামলা দায়ের করেন। মামলাটি আপোষ-রফা করতে আসামী মিজানুর রহমান বাদিকে অব্যহত ভাবে চাপ দিয়ে আসছিল। কিন্তু বাদি তাতে সায় না দিলে শশীভূষণ থানা পুলিশ মাদক বিরোধী অভিযানের নামে গভীর রাতে আসামী মিজানুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে বাদি আবদুল মান্নানের বাড়ি হানা দিয়ে ছেলে মনির হোসেনকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে আসে। পরদিক মনির হোসেনকে ১০পিস ইয়াবাসহ মাদক বিক্রেতা সাজিয়ে মিথ্যা মামলা দিয়ে আদালতে সোপর্দ করে। মেয়ের ‘খুন আর লাশ গুম’ মামলা তুলে দিতে আসামীদের অব্যহত হুমকী, পুলিশের চাপ আর পুলিশ আসামীর সংঘবদ্ধ অপতৎপরতায় জীবনের নিরাপত্তাহীর শংকায় বাদি নিজেই পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ধর্ষণ আর স্ত্রীর খুন ও লাশ গুমের মামলার আসামী মিজানুর রহমান পুলিশকে সাথে নিয়ে দাপটে বেড়াচ্ছেন।

পরিবারের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, কহিনুর আক্তার সাথীর বিয়ে হয় নারায়গঞ্জের সুমনের সাথে। সেখানে তার ৭/৮ বছরের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। প্রথম স্বামীর সংসারে থাকার সময় ভাগ্যবদলের আশায় বিদেশে পাড়ি জমান কহিনুর আক্তার সাথী। মালয়েশিয়া, দুবাই, কাতারসহ কয়েকটি দেশে প্রবাস জীবনে বেশ মোটা অংকের টাকার মালিক হন। প্রবাস থেকে ছুটিতে দেশে আসার পর চরফ্যাশন বাজারের কোটিপাতি ব্যবসায়ী মিজানুর রহমানের সাথে পরিচয় এবং প্রেম প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে উঠে। যার প্রভাবে কহিনুর আক্তার সাথীর প্রথম সংসার ভেঙ্গে যায়। মিজান-কহিনুর সম্পর্কের ফলে অন্তঃস্বত্ত্বা হয়ে পরেন তিনি। এসময় কহিনুর আক্তার সাথী তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিলে মিজানুর রহমান অস্বীকৃতি জানায়। ফলে ভোলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন কহিনুর আক্তার সাথী। এই মামলায় জেলেও যায় মিজানুর রহমান। পরবর্তীতে আপোষ-রফায় জামিনে বের হয়ে গত বছর (২০১৬সাল) ১৮ ফেব্রুয়ারী বাদিনী কহিনুর আক্তার সাথীকে বিয়ে করে ঘরসংসার পাতেন মিজানুর রহমান। চরফ্যাশন পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডে কলেজপাড়ার আব্দুর রব মিয়ার বাড়িতে ভাড়া থাকতেন তারা। কয়েক মাসের সংসার জীবনে মিজানুর রহমান প্রবাসী কহিনুর আক্তার সাথীর সঞ্চিত ১৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। সব টাকা পয়সা হাতিয়ে নেওয়ার পর মিজানুর রহমান বাবার বাড়ি থেকে আরো টাকা এনে দেওয়ার জন্য শারীরিক নির্যাতন শুরু করে। গত জানুয়ারী মাসে মিজানুর রহমান স্ত্রীর গর্ভের সন্তানকে কৌশলে নষ্ট করেন এবং চলমান ধর্ষণ মামলা প্রত্যাহারের জন্য স্ত্রীকে চাপ দেন। এ ঘটনায় কহিনুর আক্তার সাথী ১৪ জানুয়ারী,২০১৭ চরফ্যাশন থানায় জিডি করেন,নং ৫৪০। জিডি করার দু’দিন পর মিজানুর রহমান স্ত্রী কহিনুর আক্তার সাথীকে যৌতুকের জন্য মারধর করেন। মারধরে গুরুতর আহত কহিনুর আক্তার সাথীকে প্রথমে চরফ্যাশন এবং পরে ভোলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা করা হয়। সুস্থ হয়ে ভোলা সদর হাসপাতাল থেকে কহিনুর আক্তার সাথী শশীভূষণ গ্রামে পৈত্রিক বাড়িতে ফিরে যান। সেখান থেকে গত ৩০ মে স্বামী মিজানুর রহমান শান্তিপূর্ণ সংসার করার আশ্বাস দিয়ে স্ত্রী কহিনুর বেগমকে পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের ভাড়া বাসায় নিয়ে আসেন এবং ওই রাতেই যৌতুকের জন্য মারধর শুরু করেন। মধ্যরাতে নিজের সংকটাপন্ন অবস্থার কথা ফোনে বড়বোন রুপালীকে জানান সাথী। পরদিন সকালে পৈত্রিক বাড়ির লোকজন কহিনুর আক্তার সাথীর পৌরসভার ভাড়াবাসায় এসে আর তাকে পান নি এবং স্বামী মিজানুর রহমান বা তার পরিবারের তরফ থেকেও কহিনুর আক্তার সাথীর অবস্থান বা অবস্থা সম্পর্কে কোন সদুত্তর পাননি।

কহিনুর আক্তার সাথীর বাবা আব্দুল মান্নান অভিযোগ করেন, ওই রাতেই তার মেয়েকে হত্যার পর লাশ গুম করা হয়েছে। প্রথম দিকে তিনি থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি। দীর্ঘ সময়েও মেয়ের হদিস করতে ব্যর্থ হয়ে গত ১৮ সেপ্টেম্বর আব্দুল মান্নান ভোলার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে মেয়েকে হত্যার পর লাশগুমের অভিযোগে মিজানুর রহমানসহ ৫জনকে আসামী করে কপ্লেইন পিটিশন নং ৭১৭/১৭ দাখিল করেন। আদালতের নির্দেশে চরফ্যাশন থানায় পিটিশনটি গত ২ অক্টোবর এজাহার হিসেবে গ্রহন করা হয়।

এই মামলা করার পর আসামীদের গ্রেফতারে পুলিশ অনীহা দেখিয়ে আসছে। পাশাপাশি মামলাটি আপোষ-রফা করার জন্য পুলিশ বাদি আবদুল মান্নানকে নানাভাবে চাপ দিয়ে যাচ্ছে। খুন আর লাশগুমের মামলা প্রত্যাহারের জন্য চরফ্যাশন থানা পুলিশের চাপাচাপির পাশাপাশি আসামীরাও বাদিকে অব্যহত ভাবে হুমকী দিচ্ছে। পুলিশ আর আসামীদের হুমকী ধামকীর মধ্যে গত ৩ নভেম্বর রাতে উপ-পরিদর্শক নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে শশীভূষণ থানা পুলিশের একটি দল আব্দুল মান্নানের শশীভূষণ গ্রামের বাড়িতে হানা দিয়ে ছেলে মনির হোসেনকে তুলে নিয়ে যায়। পরদিন মনির হোসেনকে ১০পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার দেখিয়ে মাদক মামলায় আদালতে সোপর্দ করেন। পুলিশের অভিযানের সময় বোনের ধর্ষণ এবং খুন ও লাশগুমের পৃথক দু’টি মামলার প্রধান আসামী মিজানুর রহমান পুলিশের সাথে ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়। মনির হোসেন ওই দু’টি মামলার গুরুত্বপুর্ণ সাক্ষী বলে জানা গেছে। মেয়ে খুন মামলার বাদি আব্দুল মান্নান অভিযোগ করেন, ধর্ষণ এবং খুন ও লাশগুমের মামলা প্রত্যাহারে বাধ্যকরতে আসামী মিজানুর রহমানের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পুলিশ তার ছেলে মনির হোসেনকে ইয়াবার সাজানো মামলায় ফাঁসিয়েছে।

হত্যা মামলার তদন্তকরী কর্মকর্তা চরফ্যাশন থানার এস আই জাফর জানান, সাথী ও মিজানের মধ্যে পারিবারিক বিরোধ ছিল। তদন্তের এ পর্যায়ে সাথীকে হত্যা বা লাশ গুম করার মতো কোন প্রমান মিলেনে। কেউ কেউ বলছে সাথী গোপনে বিদেশ চলে যেতে পারে। সেসব বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

শশীভুষণ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হানিফ সিকদার আবদুল মান্নানের সকল অভিযোগ মিথ্যা উল্লেখ করে বলেন, মান্নানের ছেলে মনিরকে ইয়াবা সহ গ্রেফতার করা হয়েছে। এসময় পুলিশের সাথে কোন পাবলিক ছিল না। এছাড়া পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা তুলে নেওয়ার হুমকি-ধামকির অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। এবিষয়ে অভিযুক্ত মিজানুর রহমানের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তার কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

৩০ নভেম্বর, ২০১৭ ১৭:১৪ পি.এম