nagorikkantha

প্রশ্নফাঁস এ জাতীর গলারফাঁস হতে বেশি বাকি নাই বৈকি ! ‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি-নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার ।’ কিশোর কবি সুকান্ত বেঁচে থাকলে তার ‘ছাড়পত্র’ কবিতাখানি ভিন্নভাবে রচতেন । মীর মোশারফ হোসেন লিখেছিলেন প্রহসনধর্মী ‘ফাঁস কাগজ’ । তার সে ফাঁস কাগজ আর বর্তমান সময়ে ফাঁস কাগজের বিষয়বস্তুতে বিস্তর ব্যবধান থাকলেও জাতির নৈতিকতার ভিত্তিমূলে যে অবনতির চরম চিত্র প্রকাশ পেয়েছে প্রকটভাবে সে আর নতুন করে ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না । দেশের প্রায় প্রত্যেকটি পাবলিক, নিয়োগ পরীক্ষায় যখন প্রশ্নফাঁসের হিড়িক পড়তে শুরু করেছিল তখন থেকেই শিক্ষাব্যস্থায় রাহুর দশা প্রকাশ পেয়েছিল । এবার স্কুল-পর্যায়ের বিভিন্ন পরীক্ষায় বিশেষত প্রাথমিক স্তরের ওয়ান-টু ক্লাসের পরীক্ষাতেও প্রশ্ন ফাঁসের খবর শিক্ষার শনিকে তুঙ্গে পৌঁছিয়েছে । যে শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড সে মেরুন্দড আর সোজা রাখার সুযোগ বোধহয় রাষ্ট্র রাখবে না বলেই পণ করেছে ! নয়তো, চতুর্থ শ্রেণীর গণিত পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ায় সমগ্র উপজেলার পরীক্ষা স্থগিত রাখার সংবাদ এ জাতিকে শুনতে হবে কেন ? অবশ্য তাদের দোষ-ই বা কতটুকু যে রাষ্ট্রের সমগ্র পর্যায়ের পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার পরে তা জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পরেও সে প্রশ্নে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় । রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় যখন অনৈতিকতা লালন করা হয় তখন আর ব্যক্তিপর্যায়ে অনৈতিকতা বোধের উদ্রেক হওয়াটাই তো অস্বাভাবিকে পরিণত হয় ।
....
জাতির আগামীর সম্পদকে যারা নষ্ট পথে পথ দেখাতে সাহায্য করছে তারা কারা ? প্রশ্নফাঁস হয়েছে শুনেই বলে দিলাম, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবী করছি । এটাই কি সামাধান ? প্রাইমারী স্কুলের প্রশ্নফাঁসের সাথে শিক্ষামন্ত্রীর সংযোগ কতটুকু বা কতখানি ? দেশের শিক্ষাব্যবস্থার অতীত এবং বর্তমানের তুলনামূলক বিশ্লেষণে বলা চলে, রাষ্ট্র যার হাতে শিক্ষাব্যবস্থাকে উত্তরোত্তর সম্মৃদ্ধি ঘটানোর হাল দিয়েছেন সেই নাবিক কোথাও যেন সীমাবদ্ধতায় ভূগছেন । শুধু কী এটুকুই ? নৈতিকতা ভঙ্গে শিক্ষক-অভিভাবক যেখানে প্রতিযোগিতায় করছে সেখানে অন্যায় প্রকাশ পেলে যে লজ্জা হওয়া দরকার তাও আর দেখা যাচ্ছে না । যে শিক্ষক ক্লাস ওয়ানের প্রশ্ন ফাঁস করে দেয়, যে অভিভাবক ফাঁস হওয়া প্রশ্ন নিয়ে তার অবুঝ শিশুকে বেশি নম্বর পেতে উৎসাহ যোগায়-এদের কার দোষ কার চেয়ে কম ? নষ্ট পথে স্বপ্ন ভঙের প্রতিযোগিতা এরা একে অন্যের সারথী !
...
হয়ত ভাবা হচ্ছে, প্রাথমিকের প্রশ্নফাঁস! এ আর এমন কী অপরাধ ? অথচ এর চেয়ে বড় কোন অপরাধ রাষ্ট্রে থাকতে পারে না । যাদের ঘিরে রাষ্ট্রের আগামীর স্বপ্ন আবর্তিত হয় তারা যদি শুরুতেই অনৈতিকতার স্বাদ বুঝে যায় তবে তাদের দ্বারা রাষ্ট্রের সর্বনাশ ছাড়া আর কিছু আশা করা যায় না । এ রাষ্ট্র শুধু সন্ত্রাসী-জঙ্গীদের এনকাউন্টার দিয়ে থেমে থাকে কেন, শুরুতে ক্রসফায়ার তো সেই সব শিক্ষক, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্টদের দেয়া উচিত যারা প্রশ্নফাঁসের মত জাতিবিনাশী কর্মকান্ডে নেতৃত্ব দেয় । শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় এ ব্যাপারে কী ভাবেন জানি না । তবে এ রাষ্ট্রে প্রশ্নফাঁসের ব্যাপারে কথা বলা যে হুমকির তা রাষ্ট্র আগেই সতর্ক করে দিয়েছে । প্রশ্ন ফাঁস অপরাধ হিসেবে বিবেচনা হোক কিংবা না হোক-যারা এ ব্যাপারে কথা বলবে তাদের শান্তি তো অনিবার্য ! তাই বলে থেমে থাক ? অন্যের প্রতিবাদ মৃত্যু অবধি চলবে ।
....
আজকে যারা রাষ্ট্রের নেতৃত্বে দিচ্ছে তাদের হয়তো বর্তমান কর্মের জন্য খুব বেশি ভোগ পোহাতে হবে না । কিন্তু ফাঁস হওয়া প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়ে যারা বেশি নম্বর পাওয়ার স্বাদ পেয়েছে তারা যখন রাষ্ট্রের হাল ধরবে তখন আর এ জাতির দুঃসময় ফুড়াতে চাইবে না । রাষ্ট্র একটা কিছু করুক । শিক্ষা ব্যবস্থায় যে বেহাল দশা চলছে তা আগামীর জন্য ভয়াবহ রকমের অসনি সংকেত বহন করছে । শিক্ষা ব্যবস্থার উচ্চপর্যায়ের সাথে যারা সংশ্লিষ্ট তারা যখন রোগাগ্রস্থ হযে পড়ে তখন তার সংক্রামন রাষ্ট্রের সকল পরতে পরতে ছড়িয়ে যায় । সে যাতনায় ভুগছে জাতি । বছরের শুরুর দিনে উৎসব করে শিক্ষার্থীদেরকে নতুন বই দেয়া স্বার্থক হবে যদি শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্নীতির রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত করা যায় । বিগত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা বড়িই তিক্ত তবুও আশা রাখি, দায়িত্বশীলরা দায়িত্ববানের ভূমিকা নিলে সম্ভব । তবেই এ জাতির স্বপ্নগুলো শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃত হবে । ব্যর্থ হলেই, আঁধার ঢাকবে ।
...
আজকে যে সকল জাতির বিশ্ব দরবারে নাম-ডাক হয়েছে তাদের সবাই শিক্ষাকে পুঁজি করে বড় হয়েছে । আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার যে হাল তা কি আমাদেরকে সম্মানিত করতে পারবে ? একটি রাষ্ট্রের জন্য এটা সত্যই দুর্ভাগ্যের যে, এর কলাকৌশলীরা শিক্ষাখাতকে দুর্নীতিমুক্ত করতে পারছে না । বর্তমানকে নিয়েই শুধু কারো সাফল্য নির্ধারিত হয়না । প্রকৃত সাফল্য নির্ধারণ করবে আগামীর ইতিহাস এবং এর নেয়ামকের ভূমিকা নেয় শিক্ষিত সমাজ । স্বাক্ষরতার হার বাড়লেই কেবল শিক্ষিতের হার বাড়ছে এটা বলা যায়না । যে শিক্ষা নৈতিকতা লালন করে না-সেটা আদৌ শিক্ষাই নয় । শিক্ষার নৈতিকতা ধ্বংসে সমাজে যে রিপুর আগ্রাসন শুরু হয়েছে, তা থেকে শিক্ষক-অভিভাবক-শিক্ষার্থী এর অনেকেই নিরাপদ দূরত্বে নাই ।
...
রাষ্ট্র যদি প্রশ্নফাঁসের ভয়াবহতা আগাম উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয় তবে রাষ্ট্রকে তার প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে । আজকে যারা অঙ্কুরিত বীজ তারা যদি নৈতিকতার আলোকে বেড়ে ওঠার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় তবে এ সমাজে নিকট আগামীতেই বটবৃক্ষের অভাব প্রকাশ পাবে প্রকট হয়ে । শিক্ষার আঙিনা থেকে অনৈতিকতা দূর করতে যদি রাষ্ট্রের সর্বশক্তি নিয়োগ করার দরকার পরে তবুও তাই করা উচিত । কেননা শিক্ষাখাত রক্ষা পেলে গোটা জাতি বেঁচে যাবে । পৃথিবীতে যারা মহান, তারা তাদের সন্তানদের শিখিয়েছিল, নকল করে পাশ করার চেয়ে ফেল করা অনেক বেশি গৌরবের অথচ আমরা কোমলমতি শিশুদের হাতে পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন তুলে দিতে কার্পণ্য দেখাচ্ছি না । এটা যে কতটা দুঃখের এবং কতটা লজ্জার তা বুঝতে আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে । হয়তো সেদিনগুলোতে ভালো-মন্দের ব্যবধানের বোধটুকুও আর আমাদের থাকবে না । ভালোকে ভালো আর মন্দকে মন্দ হিসেবে চিহ্নিত করার যে শিক্ষাটুকু থাকা দরকার তা এখানে এখনই অনুপস্থিত; আগামী তো সূদুঢ় ব্যবধানে দাঁড়িয়ে ! ফাঁস হওয়া প্রশ্নের বেড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের থেকে আর নৈতিকতার আশা কী করে করা যাবে ? শুধু এটাই দুঃখের, আমাদের স্বপ্ন ধ্বংসের অভিযানে আমরাই নেতৃত্ব দিলাম !
....
রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।
raju69alive@gmail.com

২১ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১৫:৩৯ পি.এম