nagorikkantha

ছোটবেলায় পুতুল খেলার নেশা ছিল তার। সংগ্রহে ছিল ১৫০টির মতো পুতুল। তিনি নিজ হাতে শাড়ি ও পোশাক তৈরি করে পুতুলগুলোকে পরাতেন। পুতুলের পোশাক তৈরি করতে করতেই মনের কোণে ডিজাইনার হবার স্বপ্ন সম্ভবত বাসা বেঁধেছিল। যদিও বড় হয়ে একদিন সত্যি সত্যি দেশখ্যাত ডিজাইনার হবেন, গড়ে তুলবেন নিজের প্রতিষ্ঠান-এমন হয়তো তার পরিবারের কারো ভাবনাতে ছিল না। গল্পটা নাবিলা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শামীমা নবীর।

বাবার চাকরির সুবাদে জন্ম রাজশাহীতে হলেও বেড়ে উঠেছেন ঢাকায়। বাবা মনসুর আলী আহমেদ ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। মা হালিদা হানুম গৃহিণী। আট ভাইবোনের বড় পরিবারে শামীমা নবী দ্বিতীয়।

পুতুল খেলার শৈশবে, পুতুলের জন্য ছোট্ট হাতে তৈরি করতেন নানান ডিজাইনের পোশাক। কৈশোরে তিনি হয়ে ওঠেন পোশাক সচেতন। বাসায় সেলাই মেশিন থাকায় মায়ের কাছে শিখেছেন সেলাইয়ের কাজ। নিজের পোশাক নিজেই তৈরি করতেন। মার্কেটের সবচেয়ে আধুনিক পোশাকটি থাকতো তার সংগ্রহে। তখনো ছিল পুতুলপ্রীতি, পুতুলকে পরাতেন নিজের তৈরি দারুণ সব ডিজাইনের পোশাক। বিয়ের পরেও তার রুমে পুতুল শোভা পেত। পুতুলের প্রতি ভালোবাসা রয়ে গেছে এখনও, এমনকি পুতুলের পোশাকের প্রতিও। শামীমা নবী বলেন, পুতুলের পোশাক সেলাই করতাম। দর্জির সেলাই পছন্দ না হলে, কেটে নিজের পোশাক নিজেই আমি সেলাই করতাম। এই বিষয়টি ছোটবেলা থেকেই আমার মধ্যে ছিল।

শামীমা নবীর শিক্ষাজীবন শুরু হয় মরগান গার্লস হাই স্কুলে। এইচএসসি ও গ্রাজুয়েশন শেষ করেন ঢাকা আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে বিয়ে হয় তার। কম বয়সে বিয়ে ও মা হওয়ার কারণে পড়ালেখায় কিছুদিন বিরতি দেন। তবে থেমে যাননি। কর্মজীবনের শুরুতে পারিবারিকভাবে পোশাক তৈরির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। এখানে সফল হন তিনি। বাস্তব জীবনে পোশাকের নকশা, রং সম্পর্কে সেখানেই হাতেখড়ি। শামীমা নবী বলেন, আশির দশকে তখন গার্মেন্টস শিল্প এখনকার মতো প্রসার হয়নি। তখন দক্ষ কোনো ডিজাইনার ছিল না, দক্ষ কোনো অপারেটর ছিল না। দাঁড়িয়ে থেকে কাজ করেছি। তেমন সুযোগ-সুবিধা ছিল না। তবু বিদেশে পোশাক রপ্তানি করেছি। এবং আমাদের কাজ প্রশংসিত হয়েছে। ওটা ছিল আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। কাজ উপভোগ করতাম। পরিশ্রমকে পরিশ্রম মনে হতো না। ওই অভিজ্ঞতা এখনো কাজে লাগাচ্ছি।’

পুরো দশতলা একটি ভবনে ছিল তাদের প্রতিষ্ঠান। এক হাজারেরও বেশি নারীর কর্মসংস্থান হয়েছিল তখন। খুব কাছ থেকে নারী কর্মীদের খোঁজখবর নিতেন শামীমা। তাদের কেয়ার করতেন। বিভিন্ন সমস্যার সমাধানও করতেন। দ্বিতীয় সন্তান নাবিলার জন্মের পর মেয়েকে সময় দেওয়ার জন্য গার্মেন্টস ব্যবসা থেকে সরে আসেন। কিছুদিন ঘরে বসে থাকার পর এই নারী উদ্যোক্তা মাত্র ১৫ জন কর্মী নিয়ে ব্লক ও হাতের কাজ শুরু করেন। এই সময় তার পুঁজি ছিল মাত্র এক লাখ টাকা। তখন শুধু শৌখিন জিনিস ও নিজের জন্য পোশাক বানাতেন। সেই পোশাক সবাই পছন্দ করায় শামীমা ভাবলেন, একটা শোরুম দিলে বেশ ভালো চলবে। তিনি জানান, এ বিষয়ে কারো সঙ্গে শেয়ার করলে কেউ গুরুত্ব দিতো না। বলতো, ওহ্‌ এখন গ্যারেজের মধ্যেও বুটিকস হচ্ছে! তখন খুব জিদ চাপতো, এটাকে অনেক বড় করতে হবে। সেই জিদ থেকে ১৯৯৭ সালে পোশাক শিল্পে নাবিলা ব্র্যান্ডের জন্ম। শামীমা বলেন, ‘যে ডিজাইন করতাম, মসলিন শাড়ি-ড্রেস, সবাই খুব পছন্দ করতো। প্রথম থেকেই আমি কোয়ালিটি নিয়ে সচেতন। আমার লক্ষ্য ছিল পণ্য সুন্দর ও ভালো মানের হতে হবে। তবে দামে হবে কম।

সেই ছোট্ট উদ্যোগ আস্তে আস্তে প্রসারিত হতে থাকে। জায়গা করে নিতে থাকে অগণিত মানুষের মনে। বর্তমানে নাবিলার তিনটি শোরুম আছে উত্তরা, গুলশান ও ধানমন্ডিতে। বাজারে নাবিলা ব্র্যান্ডের এক হাজারেরও বেশি ডিজাইনের পোশাক আছে। বাংলাদেশের খ্যাতনামা এমন কোনো মডেল নেই, ‍যিনি নাবিলার পোশাক পরে মডেলিং করেননি। শুধু বাংলাদেশে নয়, পাশাপাশি ইউকে, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকাতেও নাবিলার পোশাক বেশ জনপ্রিয়। শামীমা বলেন, আমি আমাদের কালচারের সঙ্গে মিলিয়ে পোশাক তৈরি করেছি। ফ্যাশন অঙ্গনে আভিজাত্য, বাহারি ডিজাইন, ব্যতিক্রমী মান, নয়নাভিরাম ব্রাইডাল কালেকশন, কোয়ালিটি ফেব্রিক্স এবং শিল্পসম্মত মান ও মননে আপোসহীন হয়ে আমরা কাজ করে গেছি।

২০০১ সালে বৈশাখী মেলায় বৈশাখের সঙ্গে মিল রেখে পোশাক তৈরি করে নাবিলার পথচলা শুরু। ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে শামীমা নবী রাইজিংবিডিকে বলেন, আমরা পৃথিবীর যে প্রান্তে যাই, ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ নামে উন্নত দেশগুলোতে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পোশাক পাই। অথচ বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের কোনো পোশাক ব্র্যান্ড নেই। এখন আমাদের স্বপ্ন নাবিলাকে আন্তর্জাতিক পোশাক ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তোলা এবং পৃথিবীতে পোশাক শিল্পে বাঙালির ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়া।