nagorikkantha

পিতামাতার সেবা করা সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য। তারা যখন বার্ধক্যে পৌঁছান বয়সের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তাদের সমস্যাও বেড়ে যায়। তখন তাদেরকে অধিক সেবা দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। এ প্রতিবেদনে ৭টি লক্ষণ উল্লেখ করা হলো, যা দেখে বুঝবেন আপনার বয়স্ক প্রিয়জনদের শিগগির অধিক সেবা প্রয়োজন।

* অপ্রত্যাশিত ওজন হ্রাস

যখন বৃদ্ধ পিতামাতা ওজন হারাতে শুরু করবে, আপনাকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদের কি মুখ বা দাঁত ব্যথা আছে? তাদের কি চর্বণ করতে বা গিলতে সমস্যা হয়? তাদের কি বমিবমি ভাব বা পেটভরা ভাব হয়? তারা কি খাবার মজা পাচ্ছে না? খাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত যেকোনো সমস্যার জন্য আপনার পিতামাতাকে অবিলম্বে ডাক্তার দেখানো উচিত।

যদি তারা খাবার উপভোগ না করে, তাহলে তাদেরকে পুষ্টিসমৃদ্ধ ছোট স্ন্যাক সাজেস্ট করতে পারেন যা তারা সারাদিন ধরে খেতে পারে: উচ্চ ক্যালরি সমৃদ্ধ খাবার যেমন- পনির, দই, পিনাট বাটার এবং কটেজ চিজ ভালো। আপনার পিতামাতা যা পছন্দ করে ও খেতে চায় তাতে গুরুত্ব দিন। যদি ওটমিল প্রিয় হয়, তাহলে এর সঙ্গে বাটার, ব্রাউন সুগার, কিশমিশ, শুকনো ক্র্যানবেরি, কাজুবাদাম অথবা আখরোট বাদাম যুক্ত করুন। আপনার পিতামাতাকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, তারা এমন এক বয়সে আছে যখন ক্যালরি সীমিত করা উচিত নয়।

ব্রাইটস্টার কেয়ারের চিফ কোয়ালিটি অফিসার এবং কেয়ারগিভিং অ্যান্ড হেলথকেয়ার এক্সপার্ট শ্যারন রথ ম্যাগুয়ার বলেন, ‘প্রোটিন পানীয়ও বিবেচনা করুন। মার্কেটে পুষ্টিমানসমৃদ্ধ অনেক প্রোটিন পাউডার পাওয়া যায় যা উচ্চমানের ক্রিমারের বিকল্প হিসেবে আইসক্রিমের ওপর বা কফিতে ঢেলে খেতে সুস্বাদু।’ প্রিয় খাবার বা পানীয় অথবা এমনকি প্যানকেক, ডেজার্ট ব্রেড, পটেটো ডিশ এবং স্যুপর মতো রেসিপির সঙ্গেও প্রোটিন পাউডার যুক্ত করা যেতে পারে।

* দুর্বল ভারসাম্য

বৃদ্ধদের জন্য মারাত্মক হতে পারে পড়ে যাওয়া, তাই আপনার পিতামাতা আশপাশে যেন নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে সে ব্যাপারে খেয়াল রাখুন। নিশ্চিত হোন যে তাদের কক্ষ নিরাপদ: আলোকসজ্জার উন্নয়ন করে, পাপোশ ও টলায়মান বা ঝুঁকিপূর্ণ আসবাবপত্র দূর করে এবং যন্ত্রপাতি ও ল্যাম্প কর্ড যাতে ক্ষতির কারণ না হয় তা নিশ্চিত করে আপনি তাদের পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি হ্রাস করতে পারেন।

যদি ভারসাম্য সমস্যা হঠাৎ বা সম্প্রতি দেখা দেয় তাহলে ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করুন: নতুন ওষুধ, ওষুধের পরিবর্তন, কানের ভেতর ইনফেকশন, রক্তচাপের পরিবর্তন এবং ডায়াবেটিস বা রক্ত শর্করার হ্রাসবৃদ্ধি হতে পারে তাদের পড়ে যাওয়ার কারণ।

আপনার বৃদ্ধ পিতামাতার কেন বা ওয়াকারের প্রয়োজন হতে পারে অথবা অন্য কোনো ব্যবস্থা নিতে কোনো ডাক্তার বা ফিজিক্যাল থেরাপিস্টের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন। যদি তাদের ব্যালেন্স অত্যধিক খারাপ না হয় তাহলে শিথিলতা, ভারসাম্য ও স্বাস্থ্যের জন্য মেডিটেটিভ ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ ‘তাই চি’ সাজেস্ট করতে পারেন! তাই চি বিষয়ক গবেষণা বলছে যে, এটি বৃদ্ধদের ভারসাম্যের জন্য বিস্ময়করভাবে কাজ করে।

রথ ম্যাগুইয়ার বলেন, ‘তাদের টলায়মানতা বা দুর্বল ভারসাম্য দ্রুত তদারক করা খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি পড়ে যাওয়ার কারণ হতে পারে এবং দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এছাড়া ডিজি স্পেল বা ভারসাম্য হারানোর সম্ভাবনার কারণে বৃদ্ধ প্রাপ্তবয়স্করা কার্যক্রম সীমিত করতে পারে এবং সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হতে পারে।’

* নিম্নগামী মেজাজ

রথ ম্যাগুয়ার সতর্ক করেন, ‘হঠাৎ করে মেজাজ নিচের দিকে নেমে গেলে অথবা মেজাজ খারাপ হলে তা কোনো মারাত্মক লক্ষণ হতে পারে।’ এটি হরমোনগত ভারসাম্যহীনতা, ওষুধের সমস্যা, বন্ধুবিয়োগ অথবা একাকিত্বের নির্দেশ করতে পারে। যদি এ সমস্যা লেগে থাকে, আপনি কোনো সাইকোথেরাপি বা কাউন্সেলিং সেশনের কথা ভাবতে পারেন এবং এমন কাউকে খুঁজুন যিনি বার্ধক্যে বিশেষজ্ঞ। রথ ম্যাগুয়ার বলেন, ‘বিষণ্নতা মারাত্মক হতে পারে- বিশেষ করে বার্ধক্যগ্রস্ত পুরুষদের মধ্যে আত্মহত্যার হার খুব বেশি।’ তিনি যোগ করেন, ‘তাদের বিরূপ মেজাজকে গুরুত্বসহকারে নেওয়া উচিত। ঘর থেকে অস্ত্র বা জীবননাশক উপকরণ সরিয়ে ফেলতে আমি বিশেষত বার্ধক্যগ্রস্ত পুরুষদের আত্ম-ক্ষতি বা আত্মহত্যার ভাবনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে দ্বিধা করি না।’

নিশ্চিত হোন যে আপনার পিতামাতা সামাজিকভাবে ব্যস্ত রয়েছে- বেশিরভাগ সিনিয়র কমিউনিটি অনেক সামাজিক সুবিধা দিয়ে থাকে। স্থানীয় উপসনালয়ে, সিনাগগ অথবা মন্দিরে কি বয়স্কদের জন্য প্রোগ্রাম আছে? কমিউনিটিতে কি সিনিয়র সেন্টার আছে যা খাবার, প্রোগ্রাম বা সোশ্যাল ইভেন্টের আয়োজন করে?

যদি আপনার পিতামাতা চলাফেরা করতে শারীরিকভাবে সক্ষম থাকে, তাহলে তারা পছন্দ করে এমন ক্ষেত্র যেমন- উপসনালয়, আর্টস সেন্টার, স্কুল, লাইব্রেরি, মিউজিয়াম, হিউম্যান সোসাইটি, ফুড প্যান্ট্রি অথবা অন্য কোনোখানে ভলান্টিয়ারের দায়িত্ব দেওয়া যায় কিনা দেখুন। এতে তাদের মন-মানসিকতা ভালো থাকবে।

* অনিয়ন্ত্রিত প্রস্রাব

অনিয়ন্ত্রিত প্রস্রাব স্পষ্টতই একটি নাজুক সমস্যা। আপনার পিতামাতাকে জিজ্ঞেস করুন যে, এটি ঘনঘন হয় কিনা এবং এটি সম্প্রতি ডেভেলপ করেছে কিনা।

অনিয়ন্ত্রিত প্রস্রাব মূত্রনালীর ইনফেকশন, স্নায়বিক সমস্যা অথবা অন্য কোনো মেডিক্যাল সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। রথ ম্যাগুয়ার বলেন, ‘মনে করবেন না যে এটি বার্ধক্যতার স্বাভাবিক অংশ।’

আপনি আপনার পিতামাতাকে ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল থেকে বিরত থাকার জন্য সাজেস্ট করতে পারেন, কিন্তু তারা এখনো তরল গ্রহণ বজায় রাখতে পারেন। আপনি তাদেরকে এমন প্রোডাক্ট এনে দিতে পারেন যা অনিয়ন্ত্রিত প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

* পরিষ্করণে অসমর্থতা

বৃদ্ধ বা বার্ধক্যগ্রস্ত পিতামাতা তাদের কাপড়-চোপড়, বিছানা, কক্ষ অথবা অন্য কিছু পরিষ্কার করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে। তাদের এসব কাজ আপনি ও আপনার পরিবারের অন্য সদস্যরা করে দিতে পারেন, অথবা তাদের প্রয়োজনীয় সবকিছু পরিষ্কার করার জন্য উপযুক্ত লোক নিয়োগ করতে পারেন।

* ওষুধ গ্রহণে বিস্মরণ

স্মৃতিভ্রংশতার কারণে বৃদ্ধ পিতামাতা ওষুধ গ্রহণ করতে ভুলে যেতে পারে। যদি তাদের ডিমেনশিয়া বা মেমোরি লস থাকে, তাদেরকে ওষুধ গ্রহণের ব্যাপারে স্মরণ করিয়ে দেওয়া উচিত। আপনি এবং আপনার পরিবারের অন্য সদস্যরা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার এ কাজটি করতে পারেন অথবা এর জন্য উপযুক্ত লোক নিয়োগ করতে পারেন।

বর্তমানে ওষুধ গ্রহণের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য স্মার্টফোন অ্যাপস রয়েছে এবং কিছু অ্যাপস এমনভাবে প্রোগ্রাম করা যা আপনাকে আপনার পিতামাতা ওষুধ গ্রহণ করেছে কিনা তা জানাতে অ্যালার্ট পাঠাবে।

* অত্যধিক ঘুম কিংবা ঘুমহীনতা

রথ ম্যাগুয়ার বলেন, ‘যদি ঘুমের সমস্যা হয়, তাহলে বর্তমান ঘুমের প্যাটার্ন ও প্র্যাকটিস লক্ষ্য করুন।’ তারা কি ব্যথার কারণে ঘুমাতে পারে না? এ প্রসঙ্গে রথ ম্যাগুয়ার বলেন, ‘যদি তাই হয়, অপশনের জন্য ফার্মাসিস্ট অথবা হেলথকেয়ার প্রোভাইডারের সঙ্গে কথা বলুন। বিছানায় যাওয়ার পূর্বে অ্যাসিটামিনোফেন সেবন ঘুম আনয়নে সাহায্য করতে পারে।’ তিনি পরামর্শ দেন, যদি তারা ঘুম বা রিলাক্সের জন্য অ্যালকোহলের দিকে ঝুঁকে পড়ে, এর পরিবর্তে ভালো ঘুমের পরিবেশ সৃষ্টি করতে তাদেরকে মধুর সঙ্গে হারবাল টি পান করা, সফট মিউজিক শোনা, উষ্ণ গোসল কিংবা পা ভেজানোর জন্য সাজেস্ট করতে পারেন।

যদি আপনার বার্ধক্যগ্রস্ত পিতামাতা রিলাক্স নিতে না পারে, এ সমস্যা সমাধানের জন্য তাদের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত আলোচনা করুন। তাদেরকে ম্যাসাজ থেরাপি সাজেস্ট করতে পারেন। রথ ম্যাগুয়ার বলেন, ‘কারো কারো জন্য এর সমাধান হচ্ছে বই পড়া। যদি বই পড়া কঠিন লাগে, তাহলে অডিও বুক ও পডকাস্টের মতো অনেক অপশন আছে।’

তথ্যসূত্র : রিডার্স ডাইজেস্ট