nagorikkantha

১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন’স ডে বা ভালোবাসা দিবস। এ দিবসের মূলমন্ত্র ভালোবাসা। ভালোবাসা প্রকাশ করতে এ দিনে কপোত-কপোতীরা নানা উদ্যোগ নেন। সব দেশে যে ভালোবাসা দিবসের প্রথা একই রকম এমন নয়। এ প্রতিবেদনে ১৪টি দেশের ভালোবাসা দিবসের প্রথা সম্পর্কে উল্লেখ করা হলো।

* জার্মানি: আপনি জার্মান ক্লাসরুমে আকর্ষণীয় ক্ষুদ্র হৃদয়-আকৃতির কার্ড পাবেন না। ক্রস-কালচারাল ট্রেইনার এবং প্রোটোকল অ্যান্ড এটিকেট ওয়ার্ল্ডওয়াইডের প্রতিষ্ঠাতা শ্যারন শোয়াইতজার বলেন, ‘জার্মানিতে কেবলমাত্র প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ভালোবাসা দিবস নির্ধারিত। এটি যথাযথভাবে পূর্ণবয়স্কদের একটি বিষয়।’ আপনি দিনটিতে রোমান্সের জন্য অনেক শূকর দেখতে পাবেন, কারণ পশুটি ভাগ্য ও যৌনকামনার প্রতীক। দম্পতি বা প্রেমিক-প্রেমিকারা একে অপরকে শূকরের মূর্তি ও ছবি উপহার দেয়, এমনকি শূকর আকৃতির চকলেটও। যেখানে আমেরিকানরা ভালোবাসা দিবসে ডেজার্ট হিসেবে চকলেট পছন্দ করে, সেখানে জার্মানরা রোমান্টিক বার্তাযুক্ত হৃদয়-আকৃতির জিনজার কুকিতে কামড় বসায়।

* দক্ষিণ কোরিয়া: যুক্তরাষ্ট্রে ভালোবাসা দিবসে বেশিরভাগ উপহার পুরুষেরা দিয়ে থাকে, কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়াতে এর বিপরীতটাই সত্য- এখানে নারীরা তাদের পুরুষ সঙ্গীদের চকলেট উপহার দেয়। এক মাস পর হোয়াইট ডে-তে পুরুষেরা ক্যান্ডি প্রদান করে এই শুভেচ্ছা রিটার্ন করে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়- কখনো কখনো সিঙ্গেল ফ্রেন্ডরা ব্ল্যাক ডে-তে (১৪ এপ্রিল) ব্ল্যাক নুডলস খাওয়ার জন্য একত্রিত হয়।

* জাপান: জাপানেও ভালোবাসা দিবসে নারীরা চকলেট উপহার দেয়। যদিও সেখানে কিছু তারতম্য আছে। সহকর্মী ও সহপাঠীরা অবলিগেশন চকলেট বা গিরি চকলেট প্রত্যাশা করে। নারীরা তাদের সুইটহার্টদেরকে ট্রু ফিলিং চকলেট বা হনমেই চকলেট গিফট করে যা বেশ দামি এবং প্রায়ক্ষেত্রে গৃহজাত। যদি তারা একমাস পর হোয়াইট ডে-তে পুরুষদের কাছ থেকে প্রতিদানের অপেক্ষায় থাকতে না চায়, ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখে তারা নিজেরাই নিজেদেরকে জিবুন চকো ট্রিট করে।

* ইতালি: শোয়াইতজার বলেন, ‘ভালোবাসা দিবসে যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে সহপাঠী ও পরিবারের সদস্যরা কার্ড বিনিময় করে, সেখানে ইতালিতে শুধুমাত্র প্রেমিক-প্রেমিকারা এ দিনটি উদযাপন করে।’ ইতালিতে বাচি পেরুজিনা চকলেট জনপ্রিয় যার ফয়েলের ভেতর রোমান্টিক ম্যাসেজ থাকে। শোয়াইতজার বলেন, ‘ইতালিয়ান ‘বাচি’ শব্দের অর্থ ‘চুম্বন’। এক বাক্স বাচি পেরুজিনা হ্যাজেলনাট চকলেট বিনিময়ের মানে হচ্ছে চুম্বন বিনিময় করা।’

* ডেনমার্ক: ডেনমার্কে লাল গোলাপের বিকল্প হিসেবে স্নোড্রপ নামক ফুলটি জনপ্রিয়। ডেনিশ পুরুষেরা মাঝেমাঝে নারীদেরকে মজার কবিতা পাঠায় যা গায়েক্কেব্রেভ নামে পরিচিত- তারা এসব বেনামে পাঠায়, যেখানে ডটের সিরিজ থাকে। যদি প্রাপক অনুমান করতে পারেন যে কে পত্রটি পাঠিয়েছে, তিনি তাকে ওই বছর ইস্টার এগ প্রদান করেন।

* ফ্রান্স: ভালোবাসা দিবসে ভালোবাসার শহর হিসেবে প্যারিস হচ্ছে স্বামী-স্ত্রী বা প্রেমিক-প্রেমিকার জন্য জনপ্রিয় গন্তব্যস্থান। শোয়াইতজার বলেন, ‘কিছু লোক মনে করে যে, প্যারিস হচ্ছে ভালোবাসা দিবসের জন্য বিশ্বের ক্যাপিটল বা মন্দির।’ দম্পতি বা প্রেমিক-প্রেমিকারা পন্ট দেস আর্ট ‘লাভ লক ব্রিজ’-এ একটি তালা যুক্ত করেন এবং তালাটি শীন নদীতে নিক্ষেপ করেন। ২০১৫ সালে তালাগুলো অপসারণ করা হয় এবং ব্রিজটির রেলিং এমনভাবে প্রতিস্থাপন করা হয় যাতে তালা সংযুক্ত করা দুরূহ, কিন্তু প্রেমপাগল মানুষেরা এখনো প্যারিসের অন্য একটি ব্রিজে তালা সংযুক্ত করেন। শোয়াইতজার বলেন, ‘কিন্তু ফ্রান্সে রোমান্সের জন্য প্যারিসই একমাত্র গন্তব্যস্থান নয়, ভালোবাসার উৎসবকে কেন্দ্র করে ভিলেজ অব সেন্ট ভ্যালেন্টিনকে প্রতিবছর আকর্ষণীয়ভাবে সাজানো হয়।’ এই দিনের কার্যক্রমসমূহের মধ্যে আছে বিবাহ, প্রতিজ্ঞার পুনরাবৃত্তি এবং ভালোবাসার স্মৃতিরক্ষার্থে বৃক্ষরোপণ। ফ্রেঞ্চ কাপলরা কার্টেস ডি’অ্যামিস নামক চমৎকার লাভ নোটও আদান-প্রদান করে।

* মেক্সিকো: শোয়াইতজার বলেন, ‘মেক্সিকোতে ১৪ ফেব্রুয়ারি শুধুমাত্র কাপলদের জন্য নয়, সেখানে এটি ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়।’ ভালোবাসার মানুষ ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে বেলুন, ফুল, খেলনা প্রাণী এবং কার্ড উপহার দেওয়া হয়।

* চীন: চীনে ভালোবাসা দিবস দিনকে দিন আরে জনপ্রিয় হচ্ছে, কিন্তু সেখানে কিশি ফেস্টিভ্যালকে প্রায়ক্ষেত্রে চাইনীজ ভ্যালেন্টাইন’স ডে বা চৈনিক ভালোবাসা দিবস বলা হয়, যা চৈনিক দিনপঞ্জি অনুসারে সপ্তম চান্দ্রমাসের সপ্তম দিনে উদযাপন করা হয়- যা সাধারণত আগস্টে পড়ে। এ দিনে ঐতিহ্যগতভাবে নারীরা ভালো স্বামী পাওয়ার জন্য অথবা সেলাই দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রার্থনা করে। বর্তমানে চৈনিক ভালোবাসা দিবসের সঙ্গে পাশ্চাত্য ভালোবাসা দিবসের অনেক মিল রয়েছে।

* ফিনল্যান্ড ও এস্তোনিয়া: ফিনল্যান্ড ও এস্তোনিয়ায় সিঙ্গেল মানুষদের একাকীত্ব অনুভব করার প্রয়োজন নেই, উভয় দেশে ভ্যালেন্টাইন’স ডে বা ভালোবাসা দিবসকে ফ্রেন্ড’স ডে বা বন্ধু দিবস বলা হয়। কার্ড ও গিফট প্রকাশ করে যে বন্ধুত্বকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে, তাকে কিন্তু রোমান্টিক ভালোবাসারও সুযোগ আছে। এস্তোনিয়ায় ‘লাভ বাস’-এ আরোহণ সিঙ্গেল লোকদের রোমান্স খুঁজে পাওয়ার সুযোগ দেয়।

* স্লোভেনিয়া: অন্যান্য দেশের মতো স্লোভেনিয়ায় ১৪ ফেব্রুয়ারি আবেগপ্রবণ ভালোবাসা দিয়ে উদযাপিত হয় না। স্লোভেনিয়ায় এ দিনটি মাঠে কাজের সূচনা নির্দেশ করে এবং ভ্যালেন্টাইন’স ডে এখানে কৃষিভিত্তিক উপায়ে উদযাপিত হয়- স্লোভেনিয়ানরা সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনকে প্যাট্রন সেইন্ট অব স্প্রিং বলে। মিথ আছে যে, ১৪ ফেব্রুয়ারিতে পাখিরা তাদের প্রিয়জনদের প্রপোজ করে বা বিয়ে করে। স্লোভেনিয়ানদেরও রোমান্সের দিন রয়েছে এবং তা হচ্ছে ১২ মার্চ- এটিকে তারা সেইন্ট গ্রেগরি’স ডে বলে। এ দিনটি কাপলদেরকে রোমান্স উদযাপন করতে সুযোগ দেয়।

* পেরু: ভালোবাসা দিবসে পেরুভিয়ানরা গোলাপের পরিবর্তে সাধারণত অর্কিড উপহার দেয়। সেখানে এ দিনটি বিয়ে করার জন্য জনপ্রিয়, এ সময় গণবিয়ে সম্পাদিত হয়।

* চেক প্রজাতন্ত্র: চেক প্রজাতন্ত্রে ভালোবাসা দিবস সাধারণত টিপিক্যাল রোমান্টিক ডিনার এবং গোলাপ ও চকলেট গিফট করার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু সেখানকার প্রধান ভালোবাসা দিবস হচ্ছে পয়লা মে, যখন কাপলরা সুখ ও ভালো স্বাস্থ্যের উদ্দেশ্যে চেরি গাছের নিচে চুমু খায়।

* ইসরায়েল: শোয়াইতজার বলেন, ‘ইসরায়েলে ১৪ ফেব্রুয়ারি খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, কিন্তু প্রাচীন ইহুদী উৎসব তু বি’আভ-কে ভ্যালেন্টাইন’স ডে বা ভালোবাসা দিবসের মতো মনে হয়। এটি ভালোবাসা ও পুনর্জন্ম সম্পর্কিত। ইসরায়েলিরা ফুল ও হৃদয়-আকৃতির ট্রিট দিয়ে রোমান্টিক ভালোবাসা উদযাপন করে।

* ব্রাজিল: ব্রাজিলিয়ানরা সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন উদযাপনের পরিবর্তে জুনের ১২ তারিখ সেইন্ট অ্যান্থনিকে (বিয়ে ও সম্পর্ক গড়ার প্যাট্রন সেইন্ট) অনার করে। এ দিনটির পূর্বরাতে সিঙ্গেল নারীরা খন্ড খন্ড কাগজে পুরুষদের নাম লিখে ভাঁজ করে। তারা সকালে ওইসব ভাঁজ করা কাগজ থেকে একটি তুলে নেয় এবং এভাবে নির্ধারিত হয় তাদের ভবিষ্যৎ স্বামী।

তথ্যসূত্র : রিডার্স ডাইজেস্ট