nagorikkanthanagorikkantha

যুগে যুগে বাংলাদেশীদের ওপর যারাই মাতুব্বরী করার সুযোগ পেয়েছে তারা সত্যিকারেই ভাগ্যবান। এমন নিরীহ জাতি আর কোথায় মেলে? যাই করেন আর বলেন খালি হুম হুম উত্তর পাবেন! ষাঁড়ের নাক ছিদ্র করে লোহার কয়রা লাগালে তাও ষাঁড় মাঝে মাঝে এদিক-ওদিক নাক দেয় কিন্তু এ জাতি বড্ড বেশি নিরীহ, অসীম শান্ত। কয়টা ১০ টাকার নোট যোগে যে ১০ টাকা কেজি প্রতি’র চাল ঘরে তুলতে হয় সে হিসেব কেউ কোনদিন চায়নি। শুনেছি মাথাপিচু আয় ১৬০২ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, রিজার্ভ প্রতিদিন গত দিনের রেকর্ড ভাঙছে, দিনে দিনে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে অথচ রিকশাওয়ালার ঘাম শুঁকায়নি মোটে। ঠেলাওয়ালার নিত্যদিন সড়ক পথে কষ্টে জিহ্বা বেরিয়ে আসে! যে মধ্য আয়ের বাবার ছেলে-মেয়ের পড়ার খরচ জুটিয়ে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করতে হয় তিনি বোঝেন জীবন কাহাকে বলে! কিছুটা উপকার অবশ্য হয়েছে যারা বিদেশের ব্যাংকে টাকা রাখতে পারছে কিংবা সর্দির তীব্রতা মাপাতে জনগণের টাকায় হাজার মাইল উড়ে যেতে পারছে। সেই আমীর ওমরাদের জীবনের মত করে কেউ কেউ ভৃত্য-দাসীর ওপর নির্বাহ করে আভিজাত্য মেথে বিদেশে দেশের টাকায় ফূর্তি-ফার্তিও করছে। আহা! দেশপ্রেম এটারেই বলে!

নিন্দুকেরা বলবে, বিদেশ থেকে যে ঋণ গ্রহন করা হয়েছে তাতে জনপ্রতি বাংলাদেশী মাথাপিচু হাজার তিরেশেক টাকা ঋণী। কোথাও কোথাও দেশের স্বার্থ উৎসর্গ করে দেয়ারও গুঞ্জন ওঠে। আরে ভাই তাতে আপনার কি? আদারীর ব্যাপারীর জাহাজের খবর নিয়ে লাভ আছে? দিচ্ছেন তো কয়টা পয়সা ট্যাক্স মাত্র! বছরের এমাথা-ওমাথায় বিদ্যুত আর গ্যাসের দাম মাত্র কয়েক পয়সা করে বাড়ে-তাতে আর এমন প্রতিক্রিয়া করার কি আছে ! প্রশংসা করতে শিখুন। জ্বি হুজুর জাঁহাপনা শিখতে না পারলে, তোয়াজ-নেওয়াজ না কতে পারলে, পদলেহী হতে না পারলে উন্নতির কোন সম্ভবনা নাই! বাপু, এ দামী কথা মনে রাইখেন!

দেশে সত্যি সত্যিই ডিজাইটাইজেশনের হিড়িক পড়েছে। পেটের ক্ষুধা নিভারণের জন্য চাল কিনতে হয় ৬৫-৭০ টাকা কেজি ধরে আর কথা বলার জন্য মোবাইল সিম পাচ্ছে প্রায় ফ্রিতে। একটা কিনলে আরও কয়েকটা ফ্রি ! রাত বারোটার পর কথা প্রায় ফ্রি! অবশ্য ডিজাটাল বাংলাদেশের খুব বেশি প্রশংসা করার সাধ্য আমার নাই কেননা আমার বুড়ো বাবা-মা যেখানে অসহ্য যন্ত্রনায় দিনযাপন করে সেখানে এখনো বৈদ্যুতিক আলোর দেখা মেলে নি। কাজেই কষ্ট তো কিছু মনে আছেই! দেশ এনালগ ছেড়ে ডিজাটালের যাত্রায় বহুদূর এগিয়ে গেলেও আমার মন সেই এনালগের যাত্রার পূর্ব পথেই হাঁটতে শেখেনি!

এদেশের কারো কাছেই কেউ কোনদিন জানতে চায়নি, ভাই, হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে রাস্তা নির্মান করার পরেও তা বছরের শেষ না হতেই চলার অযোগ্য হয় কেন? বৃষ্টি নামার আগেই শহর নদী হয় কেন? প্রতিদিন নিত্য পণ্যের দাম বাড়ে কেন? রাষ্ট্রের যেন সেক্টর বিদ্রোহী হলে রাষ্ট্র অচল হয় কেন, পরিবহন শ্রমিকেদের ধর্মঘটে ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ পড়ে কেন? জানতে চাইলেই বা কী? তারা কি আর জবাব দিতে বাধ্য! আগে তাও ক্ষমতায় যেতে জনগণের ভোট লাগতো, এখন ওদিন হয়েছে বাসী। কাজেই আর কোন দায় রইলো না!

পার্শ্ববর্তী বন্ধুবর দেশ কেবল চেপে যাচ্ছে, নিংড়ে নিচ্ছে অথচ আমরা দিয়েই যাচ্ছি। আহা! প্রেম! ভিক্ষার সুরেও চেয়েও প্রয়োজনের সময় একটু পানি পাইনা অথচ যখন প্রয়োজন নাই তখন আমাদের ভাসিয়ে দিতে একটুও কার্পণ্য নাই। জীবন ভেসে যায়, জমি-জিরাত খেত-খামারের সব । তাদের কাছেই বস্তা নিয়ে ছুটি আবার বেঁচে থাকার খাদ্য কিনতে! এসব নিয়ে একটু প্রতিবাদের আয়োজনও কোনদিন করার মুরোদ দেখায়নি কেউ-ই। দাদাদের ওপর কথা বলা বেয়াদবী! আমরা ভদ্র জাতি! বউয়ের কাপড় খুলে আমরা অন্যের শরীর আবৃত করে লজ্জার হাত থেকে বাঁচি!

আমরা গর্বিত, আমরা আনন্দিত। আমাদের নেত্রীত্রয় প্রতিদিন নিত্য নতুন তকমা পাচ্ছেন। নেতারা কথা কম বলেন বটে কিন্তু সত্য গোপন করেন বেশি! পারস্পারিক ঝগড়ায় তাদের তুল্য আর কে আছে ধরায়! তাদের গাড়ি ওল্টো পথে চলে। ভাগ্য ভালো, দেশটি এখনো সঠিক পথে চলছে। মনের ভেতরে বাহিরে অসীম দেশপ্রেম, কয়েকটাকার সিরিয়াল দিয়ে ডাক্তার দেখাই, দেশীপণ্য ভোগ করি। অথচ.............!

জাতি শান্তিতে ঘুমাও। শান্তির নোবেল এলো বলে। বহু প্রতিশ্রুতি মিলবে, চাল-সার সব ফ্রিতে খাওয়ানো হবে। মনে মনে চাকরি দেয়া হবে। ভিশন হবে ’২১ কিংবা ’৩১ কিংবা আরেকটু এগিয়ে ’৪১। হয়ে যেতে পারে ৩০৪১ ও ! মাঝে মাঝে অসংখ্য জীবনের বিনিময়ে ক্ষমতার পালাবদল হবে, হতে পারে। ক্ষমতার বাইরের-ভেতরে যারা থাকে তাদের ভাগ্য ফেরবে বটে কিন্তু আধমরাদের ভাগ্য বদলানোর জন্য কাউকে কোথাও পাওয়া যায়নি, যায়না কিংবা যাবেনা। সবাই শুঁষে নিতে ওস্তাদ! কাজেই নাক টেনে ঘুমাও আরও স্বপ্ন দেখে। ইচ্ছা জাগলে দিবাস্বপ্নও দেখা যেতে পারে! তারা রাইত বললে কাইত হবা আর দিন বললে চোখ মেলবা! সোনার বাংলাদেশে, জয়-জিন্দাবাদে চলুক!

রাজু আহমেদ। কলামিষ্ট। 
Fb.com/rajucolumnist

০৯ অক্টোবর, ২০১৭ ১৮:০২ পি.এম