nagorikkantha

নারী ও শিশু-দের জন্য সারা দেশটাই কেন যেন এক অনিরাপদ হয়ে যাচ্ছে দিনদিন। বাসা-বাড়িতে কিংবা বাহিরে কোথাও নারীরা এমন কি নিস্পাপ কোমলমতি শিশুরাও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগছে। চলন্ত বাসে, ট্রাকে, ট্রেনে, বাসা-বাড়িতে, কর্মক্ষেত্রে কোথাও নারী বা শিশু নিরাপদ নয়। তিন বছরের কন্যা শিশু থেকে শুরু করে ৬০ বছরের বৃদ্ধা, প্রতিবন্ধী নারী, কেউই বাদ যাচ্ছে না ধর্ষকদের হাত থেকে। ধর্ষণ বা গণধর্ষণ যেন এক ব্যাধির নাম। এক উম্মাদ খেলায় মেতে ওঠেছে কিছু ধর্ষকরূপী হায়নার দল। স্কুল, কলেজ, বিশ^বিদ্যালয়-এর মতো সর্ব্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জনের জায়গা, সেখানেও নারীরা নিরাপদ নয়। শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীদের যৌন হয়রানি একটি নৈমত্তিক ঘটনা। যাদের নৈতিক শিক্ষার আলো নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে দেশ ও দশের সেবা করার কথা। তারা আজ নিরাপত্তাহীন এক পাশবিক পরিবেশে জীবন অতিবাহিত করছে। দেখার যেন কেউ নাই। ক্ষমতাসীন দলের আর্শীবাদপুষ্ট হয়ে কেউ কেউ ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। ধর্ষক হিসেবে পরিচয় দিয়ে গর্ববোধ করছে। কেউ কেউ নারী ধর্ষণে সেঞ্চুরী করার রের্কডও পত্রিকার পাতায় দেখা যায়। সারা দেশে একটা ভীতিকর এক পরিবেশ তৈরী করেছে কিছু বিকৃত মানসিকতার লোক। যারা আইনের প্রতি কোনরূপ তোয়াক্কা না করে এসব করছে। পড়া-লেখার পরিবেশকে যারা কলুষিত করছে তারা আবার বীর দর্পে চষে বেড়াচ্ছে সমাজে। পাড়ায় মহল্লায় নির্বিচারে চলছে ধর্ষণের মহোৎসব। তুফান মেইল বেগে বলা যায়।

বিভিন্ন সংস্থার তথ্যানুযায়ী বিগত ৬ বছরের মধ্যে প্রতিবছর গড়ে যতটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে গত ৬মাসেই তা ছাড়িয়ে গেছে। ‘বাংলাদেশ মানবাধিকার সংস্থার’ তথ্যানুযায়ী বিগত জানুয়ারি-জুলাই ২০১৭ পর্যন্ত ১১৯ জন নারী গণধর্ষিত হয়েছে। আর একই সময়ে ধর্ষিত হয়েছে ৫২৬ জন নারী। শুধু জুলাই মাসে ৯৭ জন নারী ধর্ষিত হয়েছে। আর ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৪১ জনকে। এই ভয়াবহ অপরাধ যে হারে বাড়ছে, তা অব্যহত থাকলে দেশে নারীদের অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা ভাবতে হবে। অপরাধ বিজ্ঞানী ও সমাজ বিজ্ঞানীরাও এনিয়ে চিন্তিত। খাবার-এর প্রলোভন, ভালো কলেজে ভর্তির সুযোগ কিংবা চাকুরী দেয়ার নামে অথবা কোন সুযোগ পাইয়ে দেয়ার নাম করে নিরীহ দরিদ্র ও পরিবারের মেয়েদের ফাঁদে ফেলে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। প্রেমের প্রস্তাবে রাজী না হলে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা আর কি হতে পারে? ফেইসবুকে প্রেমের আলাপ করে বন্ধুত্ব গড়ে তুলে এক পর্যায়ে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সরলমনা কিশোরীদের ধর্ষণের ঘটনাও ঘটছে। আবার কোনভাবে ধর্ষণের ঘটনা ভিড়িও/মোবাইলে ধারণ করে পরবর্তীতে ব্লাকমেইল করে দীর্ঘদিন ধর্ষণ করার নজিরও আছে। স্বেচ্ছায় সম্পর্কের কারণে ধর্ষিত হলে কাউকে বলারও কিছু থাকে না। ফলে নিরবে সহ্য করা ছাড়া আর কি করার থাকে? তবে পাড়া-মহল্লার অনেক ধর্ষণের খবর পত্রিকায় আসে না। অনেকেই মামলা করতে চান না, বিভিন্ন রকমের হয়রানির জন্য। কিছু অসাধু পুলিশও অনেক সময় মামলা নিতে গড়িমসি করে। ধর্ষকদের ক্ষমতা ও হুমকির মুখে সবই যেন অকার্যকর ও নিরব দর্শক। ধর্ষিতাকে দায়ী করে মানসিকভাবে দূর্বল করার চেষ্টাতো আছেই। গ্রামের প্রভাবশালীরা সালিশের মাধ্যমে মীমাংসার নামে চলে আরেক অমানবিক নির্যাতন। ধর্ষকের পক্ষে রায় দিয়ে টাকা খাওয়ার সুযোগ কাজে লাগায় কেউ কেউ। আবার উল্টো ধর্ষিতা দায়ী করে অথবা খারাপ মেয়ে আখ্যা দিয়ে মাথার চুল ন্যাড়া করা, এক ঘর করে রাখা, প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত, সমাজ থেকে বের করে দেয়ার ঘটনাও আছে বিস্তর। বিচার না পেয়ে অপমান সহ্য করতে না পেরে অনেকেই এলাকা ছেড়ে দেয় অথবা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়। পুলিশ অনেক আসামীকে গ্রেফতার করে। কিন্তু প্রয়োজনীয় আলামত, যথাযথভাবে মামলা পরিচালনা অথবা প্রমাণে ব্যর্থ হওয়ার কারণে আসামীরা খালাস পেয়ে যায়।

মামলার রায়ের দীর্ঘসূত্রতা। আইনের ফাঁক-ফোকর। ধর্ষণের শাস্তির আইন অনেক পুরাতন। ধর্ষিতাকেই প্রমাণ করতে হয় যে, সে ধর্ষিত হয়েছে। মেডিকেল চেকআপ, তদন্ত কমিটি কর্তৃক তদন্ত করতে গিয়ে যে সব প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় ধর্ষিতাকে/তার পরিবারকে। এরকম কতোগুলো প্রক্রিয়া চালু আছে, তাতে পুনরায় ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটে। যা একজন ধর্ষিতাকে এবং তার পরিবারকে সামাজিকভাবে খাটো/হেয়পতিপন্ন করা ছাড়াও এক বিভ্রতকর অবস্থায় ফেলে দেয়া হয়। এসবই ধর্ষকদের জন্য একটা অনুকুল পরিবেশ যেন রাষ্ট্রই করে দিয়েছে। আর ধর্ষিতাকে সব সময় একটা ভয়ংকর ও অনিরাপদ পরিবেশ-এর দিকে নিক্ষেপ করা হয়। নারীরা কবে নিরাপদ পরিবেশ পাবে এই দেশে? ধর্ষিতদের পূর্নবাসন ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সহযোগীতার জন্য সরকারী ও বেসরকারীভাবে কিছু সেল্টার হোম্স আছে। যা প্রয়োজনের তুলনা অপ্রতুল। তবে সরকারী সেল্টার হোম্স গুলিতে খাওয়া, থাকার পরিবেশ ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়ে অনেক অভিযোগ আছে।
সামাজিক অচলায়তন। সমাজে ধর্ষিতাকে কেউ ভালো চোখে দেখে না। ধর্ষিতাকে কেউ বিয়ে করতে চায়না অথবা পরিবার কর্তৃক নিগৃহীত হয়ে এক নারকীয় জীবন যাপন করতে হয়। আমাদের পরিবার-সমাজ এখনো ধর্ষককে ঘৃণা না করে বরং ধর্ষিতাকেই ঘৃণার চোখে দেখে এবং নানান রকমের অপবাদ দিয়ে ধর্ষিতাকে আরো মানসিক চাপের মধ্যে রাখে। ফলে অনেক ধর্ষিতার স্বাভাবিক জীবন যাপন ব্যাহত করে মারাত্মকভাবে। সম্প্রতি ‘ব্রাকে’র এক গবেষণায় দেখা গেছে ৯৯% ধর্ষণের মামলার রায় হয় না। ২০-২২ বছর ধরে চলার পরও মামলার রায় হয়না এমন রেকর্ডও আছে। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও মামলার সুরাহা না হওয়া। মামলার বাদী আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হতে একসময় বিচার পাওয়ার আশা ছেড়ে দেয়া ইত্যাদি কারণ ছাড়াও মামলার সাক্ষী উপস্থিত করতে না পারা/না থাকা। আপোষ-মিমাংসা, নিরাপত্তার অভাব’সহ বিবাদীদের হুমকি ও নানান জটিলতাতো আছেই। আর এসব কারণে মামলার রায় পিছিয়ে যায়।

ক্ষমতাসীন দলের ব্যানারে থাকলে দলীয় প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে অনেকেই বিভিন্ন অপরাধ-এর সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করে থাকে। মেয়েদের কোন মানুষ মনে করে না অনেকে। আবার নারী ধর্ষণে অন্য নারী কর্তৃক সহযোগীতা করতেও দেখা যায়। এই চিত্র অত্যান্ত ভয়াবহ। ক্ষমতার দাপট ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে ধর্ষণের সংখ্যা আশংকাজনকভাবে বেড়েই চলেছে। যাদের পরিবারে কেউ ধর্ষিত হয়েছে কেবল তারাই বুঝবেন যে এটা কি ধরণের অনাচার। যাদের পরিবারে মেয়ে আছে ওই পরিবারের অভিভাবকদের সময় কাটে সব সময় দুশ্চিন্তায়। ধর্ষণের শাস্তি অনেক কঠোর আইন আছে আমাদের দেশে। কিন্তু আইনের সেইভাবে প্রয়োগ যদি শতভাগ নিশ্চিত করা যেত, তবে এত ধর্ষণের ঘটনা ঘটতনা।

এমন মেয়ে খুব কমই আছে, যারা জীবনে একবারও বখাটেদের বখাটেপনার স্বীকার হননি। বখাটেদের উৎপাতে স্বীকার হয়ে অনেকে স্কুল/কলেজে যাওয়া বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে। অনেকে প্রতিবাদ করতে না পেরে আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ পথে এগিয়ে যেতেও দ্বিধা করছে না। যারা বেঁচে আছে তারা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা মানসিক যন্ত্রণায় ছটপট করছে প্রতিনিয়ত। মাঝে মধ্যে থানায় কিছু অভিযোগ করতে দেখা যায়। কিন্তু পরিণাম আরো ভয়াবহ। পুরো পরিবারই ভিকটিম হতে দেখা যায়। ফলে অনেকেই আর অভিযোগ না করে নিরবে সহ্য করার অভ্যাস করতে থাকেন।

কর্মমূখী শিক্ষা এবং ছাত্র-ছাত্রীদের প্রকৃত বুদ্ধিদীপ্ত জ্ঞান চর্চার পরিবেশ ও মানসিক বিকাশের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। কোনভাবেই এই পরিবেশ নষ্ট হতে দেয়া যাবে না। যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষকদের চাকুরীচ্যুতি ও আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। ক্ষমতার দাপটে কোন ছাত্র কর্তৃক ছাত্রীদের যৌন হয়রানির / বখাটেপনার অভিযোগ আসলে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। গ্রামে/শহরে কোন নিরীহ দরিদ্র মেয়ে নির্যাতিত হলে তাৎক্ষণিক যেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক প্রয়োজনীয় সহায়তা ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে পারলে নারী ধর্ষণের ঘটনা অনেক কমবে বলে অভিজ্ঞমহল মনে করেন। ক্ষমতায় থাকলে/দলীয় প্রভাব খাটিয়ে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি চালু আছে, তা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে যাতে কেউ বের হতে না পারে সেইজন্য প্রয়োজনে আইন পরিবর্তন করা উচিৎ। আইন প্রয়োগকারী সংস্থারকে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। কন্যা শিশু অথবা নারীরা আপনার আমার পরিবারের সদস্যের মতো মনে করতে হবে-কারো মেয়ে, কারো বোন এইভাবে চিন্তা করার সময় এসেছে। পরিবারের সবাইকে নারীদের প্রতি নজর বাড়াতে হবে। মনমানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে পুরুষদের। মেয়েদের আরো সচেতন হতে হবে। সরকারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারী সংস্থাগুলো নারী ও শিশু ধর্ষণ/নির্যাতনের বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক কর্মসূচি আরো বাড়াতে হবে। নচেৎ জাতি কোনদিন লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারবেনা।

লেখক- আবুল খায়ের
কবি, কলামিস্ট ও ঊন্নয়ন কর্মী; khair.hrm@gmail.com